default-image

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়েছে। গত দুই মাসে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরোধকে কেন্দ্র করে চারটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।

এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন পারাপার হয়। যানজটে আটকে থাকা গাড়ি দ্রুত পার করার ব্যবস্থা করে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাবশালীরা যানবাহন পারাপারে নামে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় করেন। গত সেপ্টেম্বরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মণ্ডলের মৃত্যু হয়। এরপর ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জের ধরে হানাহানি বেড়েছে।

গত ১৯ মার্চ রাতে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও দৌলতদিয়া ইউপির চেয়ারম্যান আবদুর রহমান মণ্ডলকে (৪৫) কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় আবদুর রহমানের চাচাতো ভাই আরিফ মণ্ডল বাদী হয়ে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলামকে ১ নম্বর আসামি করে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বিবাদীদের সঙ্গে আবদুর রহমানের রাজনৈতিক ও দৌলতদিয়া ঘাটের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আগে থেকে বিরোধ রয়েছে। ১১ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলীয় সভায় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে রহমানের রাজনীতি নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। ১৯ মার্চ দলীয় সভা চলার সময়ও ১ নম্বর বিবাদীর সঙ্গে ঘাটের আধিপত্য নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়।

বিজ্ঞাপন

ওই হামলার ঘটনায় পুলিশ পৌর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক লিয়াকত হোসেনসহ (৩০) তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এর আগে ১১ মার্চ সন্ধ্যায় দৌলতদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রশিদের ব্যবসায়িক অংশীদার মিলন সরদারকে পিটিয়ে জখম করা হয়। মারধরের ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের শ্যালক রাজীবসহ ছয়জনের নামে থানায় মামলা হয়। ওই রাতে দৌলতদিয়া ঘাটের বাসার সামনে হামলায় উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তফা মণ্ডলসহ (৩৫) ৮ জন গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে মোস্তফা মণ্ডলসহ দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্যদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মোস্তফা মণ্ডল গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম মণ্ডলের ছোট ভাই।

ওই হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ১২ মার্চ আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও দৌলতদিয়া রেস্টহাউস চত্বরে প্রতিবাদ সভা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, দৌলতদিয়া ইউপির চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের মদদে ইউনিয়ন কৃষক লীগের আহ্বায়ক বাকেন শেখ ও যুবলীগ নেতা আমজাদ প্রামাণিকের নেতৃত্বে ওই হামলা হয়েছিল। এ ঘটনায় পুলিশ দৌলতদিয়া ইউনিয়ন কৃষক লীগের আহ্বায়ক বাকেন শেখকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে।

এ বিষয়ে দৌলতদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রশিদ বলেন, ‘দৌলতদিয়া ঘাটের একক আধিপত্যকে ছিন্ন করতে পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে ইউপি নির্বাচনে আবদুর রহমানকে বিজয়ী করি। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই একের পর এক নানা ঘটনায় পরিস্থিতি আরও অশান্ত হচ্ছে। এসব ঘটনার সঙ্গে দলের অনেকেই জড়িত। এর বিহিত হওয়া দরকার।’

সম্প্রতি রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে ‘দৌলতদিয়া ঘাটের বর্তমান সমস্যা নিরসনকল্পে’ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজবাড়ী-১ আসনের সাংসদ কাজী কেরামত আলী। সভায় দৌলতদিয়া ঘাটের অপরাধমূলক কার্যক্রম দূর করতে নতুন ঘাট চালু, পুরো ঘাট সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, ঘাট থেকে ইউপি পর্যন্ত রোড লাইট ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা, টিকিট কাউন্টার থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া বন্ধ করাসহ বেশ কিছু নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলী প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দৌলতদিয়া ঘাটকেন্দ্রিক বিভিন্ন হামলা-মামলার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। যদি দলের কেউ এ ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলব, রাজনৈতিক দলের কাউকে যেন অহেতুক হয়রানি করা না হয়।

গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল তায়াবীর বলেন, দলের ভেতর কোন্দল এবং দৌলতদিয়া ঘাটের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়েছে। থানায় চারটি মামলাও হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছয়জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। দৌলতদিয়া ঘাটে দখল বাণিজ্য বা দালালি পেশাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট তৎপর রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন