স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড়লেখার হাকালুকি হাওরপারের সুজানগর, তালিমপুর, বর্নি ও দাসেরবাজার ইউনিয়নজুড়ে। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্যার পানিতে গ্রামের পথঘাট ডুবে আছে। নৌকা ছাড়া বের হওয়ার সুযোগ নেই। বেশির ভাগ মানুষের নৌকাও নেই। প্রায় বাড়িঘরেই পানি। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেছেন। পানি কিছু কমায় কিছু মানুষ ঘরে ফিরেছেন। কিছু মানুষ ফেরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বৃষ্টি দিলেই পানি বেড়ে যায়। যারা ঘরে ফিরতে চাইছেন, তারা আবারও আতঙ্কে পড়েন। উপজেলার ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো বানভাসিরা অবস্থান ও আসা-যাওয়া করছেন।

উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে মুর্শিবাদকুরা গ্রামের মো. রাজু মিয়া গতকাল শনিবার (৯ জুলাই) বিকেলে বলেন, ‘পানিতে বাড়িঘর ভাসাইয়া লইয়া (ভাসিয়ে নিয়ে) গেছে। মাইনসে (মানুষে) বাড়িত ঈদ করের (করছে)। আমরা স্কুলে আছি কোনোমতে। বাড়ি ছাড়া ঈদ করলে তো মনে শান্তি মিলে না। এর মাঝে টানাটানি তো আছেই। ঈদ কী জিনিস ইবার (এবার) আমরা কেউ বুঝিয়ার (বুঝতেছি) না।’রাজু মিয়া জানিয়েছেন, বিভিন্ন হাটবাজারে ঘুরে তিনি মাছের ব্যবসা করেন। এতে মোটামুটি ভালোভাবেই সংসার চলেছে। গত ১৭ জুন আকস্মিক বন্যায় ঘরে কোমরপানি উঠে। পানিতে ঘর ভেঙে গেছে। সেই থেকে আছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। আশপাশের বাজার পানিতে তলিয়ে থাকায় এখন বেকার। এই কদিনে সংসার চালাতে জমানো টাকা, হাঁস-মুরগি ও ছাগল বিক্রি করেছেন। এখন তার হাতে টাকাও নেই।

একই আশ্রয়কেন্দ্রের নেহারুন বেগম বলেন, ‘ঘরও কোমরপানি। আফালে সবতা ভাঙিয়া নিছেগি (ভেঙে নিয়েছে)। কিছু চাউল, দুই–তিন দিন খিচুড়ি আর পোলাও পাইছি। ইতায় (এসবে) তো পেট ভরে না। ছেলের রুজি নাই। মাইনসের কাছে আত পাতিয়ার (হাত পাতছি)। একবার খাইতে পারলে আরেকবার পারিয়ার (পারছি) না। ঈদের একটা সময়, কেউ খোঁজও নিছে না। কষ্টর মাঝে বাড়ির বাইরা কিওর (বাইরে কিসের) ঈদ। ঘরে ঠিকমতো চাউল-খরচপাতিউ নাই।’হাকালুকি উচ্চবিদ্যালয় ও হাকালুকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনটি ভবনে ৫০টি পরিবার আছে। প্রায় ৪৫টি পরিবার মুসলিম। তারা জানিয়েছেন, এবারে ঈদের কোনো আয়োজন নেই। অন্য বছরগুলোতে সাধ্যমতো তারা কেনাকাটা করেন। ঈদে সবাই মিলে আনন্দ করতেন।

অন্যদিকে বন্যার পর থেকেই ডাকাতির আতঙ্কে আছেন লোকজন। রাতে ইঞ্জিন নৌকার শব্দ শুনলেই আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি।

পশ্চিম গগড়া গ্রামের অজিত দাস গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘২১ দিন ধরে পানি। এখনই আশ্রয়কেন্দ্র থেকে সবার ঘরে ফেরা সম্ভব হচ্ছে না। ২০০৪ সালেও অনেক বেশি পানি হয়েছিল। সেই সময় থেকেও এবার পানি বেশি।’তিনি বলেন, ‘পানি আসার পর থেকে ডাকাত–আতঙ্কে রাতে আর ঘুমাই না। ভোরে ঘুমাই। হাওরপারের পূর্ব গগড়া, পশ্চিম গগড়া, কোনার গগড়া, দ্বিতীয়ারদেহী গ্রামের লোকজন পাঁচ-সাতটি নৌকায় রাতে পাহারা দিই।’

মুর্শিবাদকুরা গ্রামের মারুফ আহমদ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ঘরে পানি উঠায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রায় ১৬ দিন ছিলেন বড়লেখা শহরে। পানি কমায় বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। অনেকের ঘরের নিচ পাকা থাকায় খাটের ওপর কোনো রকম বসবাস করেছে। সেসব ঘর থেকে পানি নেমে গিয়েছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার (৭ জুলাই) রাতে প্রায় এক ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছে। এতে পানি বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, ‘পানি কমায় বাড়ি আসছিলাম। তবে এখনো রাস্তায় হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি। সড়কের ওপর দিয়ে ইঞ্জিন নৌকা চলছে। শতভাগ পানিতেই ঈদ আমরার।’

বড় ময়দান গ্রামের খয়রুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পানি নামলে হয়তো মানুষ ঠিকটাক করে ঘরে ফেরার চেষ্টা করত। এখন আর সে সুযোগ হচ্ছে না। বেশির ভাগ বানভাসি মানুষই আশ্রয়কেন্দ্রে ঈদ করছেন।’

সাংস্কৃতিক সংগঠক রিপন দাস আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘরবন্দী শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। হাওরপারের মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে মনে হচ্ছে আরও অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।’

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী গতকাল শনিবার জানান, ৪০টির মতো আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আছেন। বাড়ি থেকে পানি নেমে যাওয়ায় অনেকে চলে গেছেন। জেলা প্রশাসন থেকে একটি গরু দেওয়া হয়েছে। ঈদের দিন রান্না করে আশ্রয়কেন্দ্রের বন্যার্ত মানুষকে খাওয়ানো হবে। এ ছাড়া ৪০০ প্যাকেট খাদ্যদ্রব্য ঈদ উপহার হিসেবে আশ্রয়কেন্দ্রে বিতরণ করা হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন