বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হলে ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ হলের সিট দখল করছে। একজন মাজহারুল ইসলাম। আরেকজন শাকিল আহমেদ। মাজহারুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুর অনুসারী আর শাকিল সভাপতি গোলাম কিবরিয়ার অনুসারী। এ বিষয়ে শাকিল ও মাজহারুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই হলেই এক শিক্ষার্থীকে সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন হলের একজন আবাসিক শিক্ষক। পরে তাঁকে ছাত্রলীগ নামিয়ে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ২৪ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘দুই শিক্ষার্থীকে হলে তুলে দিলেন শিক্ষক, নামিয়ে সিট দখল ছাত্রলীগের’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই অভিযোগের বিষয়ে মাজহারুল ইসলাম বলেছিলেন, তিনি হলের সিট–বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নন। রাজনৈতিক ছাত্রদের সিট তাঁরা ছাত্রলীগ কর্মীদের পাইয়ে দিচ্ছেন শুধু। তিনি ওই দুই শিক্ষার্থীকে বের করে দেননি। পরে অন্য কক্ষে নিয়ে তুলে দিয়েছেন।

এই হলের ভারপ্রাপ্ত প্রাধ্যক্ষ মির্জা হুমায়ূন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর হলে করোনার পর ১০০-এর বেশি সিট খালি হয়েছে। তিনি ৫০টির মতো সিটে যোগ্য শিক্ষার্থীদের তুলে দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের যে কক্ষেই দেওয়া হয়, সেই কক্ষেই দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষার্থীরা আছেন। তাঁরা হলে সিট–বাণিজ্যের কথাও শুনেছেন। কিন্তু ওই রকম প্রমাণ তাঁদের কাছে নেই। ছাত্রলীগের কয়েকজন এগুলো করছে। এটা তাঁরা ঠিক করছেন না।

মির্জা হুমায়ূন কবীর আরও বলেন, প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ককে তিনি এ বিষয়ে অবগত করেছেন। তিনি বিষয়টি সেখানে তুলবেন।

প্রাধ্যক্ষদের এ বিষয়ে শক্ত হওয়ার নির্দেশনা আগে থেকেই দেওয়া হয়েছে। তিনি বুঝতে পারছেন না তাঁরা কেন এ ব্যাপারে শক্ত হচ্ছেন না।
অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

খালি সিট টুকে রাখার দায়িত্বে ছাত্রলীগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। সে হিসেবে ছাত্রলীগের হল কমিটিও নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের অনুসারী নেতা–কর্মী রয়েছেন। তাঁরাই হলে সিট দখলে তৎপর রয়েছেন। এ জন্য তাঁরা কোন হলের কতটি সিট খালি হচ্ছে বা কখন খালি হবে, তা টুকে রাখছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সিট–বাণিজ্যের টাকা অনেক নেতা–কর্মীর পকেটেও যায়।

১৭ অক্টোবর হল খোলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে একটি কক্ষ দখল নিতে চারটি নতুন তালা লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে ২০ অক্টোবর প্রথম আলোর অনলাইনে ‘এক কক্ষ দখলে নিতে চার তালা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান, শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, ১৭ অক্টোবর হল খোলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাদার বখশ, শহীদ হবিবুর রহমান, শাহ মখদুম, শহীদ শামসুজ্জোহাসহ ছাত্রদের সব কয়টি হলে রুটিন করে রাতে ও সকালে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কক্ষে কক্ষে ঘুরে কোন সিট খালি হয়েছে, তা দেখভাল করছেন। সিট খালির তথ্য পাওয়ামাত্রই তাঁরা নিজেদের কর্মীদের হলে তুলে দিচ্ছেন। এমনকি কর্মীদের কাছ থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রংপুরের একটি উপজেলার এক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁকেও তিন হাজার টাকা দিয়ে হলে উঠতে হয়েছে। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনিও প্রথম বর্ষে এসেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। কিন্তু অন্যদের মতো করে তাঁকেও টাকা দিতে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলে এক শিক্ষার্থীকে প্রাধ্যক্ষ তুলে দিয়েছিলেন। ওই শিক্ষার্থীকেও ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা নামিয়ে দেন। পরে বিষয়টি হল প্রাধ্যক্ষ ও ছাত্রলীগ মীমাংসা করে নিয়েছে। মিঠুন আলী নামের মাস্টার্সের এক শিক্ষার্থী আবাসিক হল খোলার পর এসে দেখেন তাঁর কক্ষটিই দখল হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় প্রতিটি আবাসিক হলে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা সিট দখল নিতে তৎপর রয়েছেন। প্রায় প্রতিদিনই তাঁরা সিটের খোঁজে দল বেঁধে বের হচ্ছেন। সিট পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা টাকাও নিচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের প্রাধ্যক্ষ অসহায়ত্ব প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, হল খোলার পর তাঁদের আগেই ছাত্রলীগ থেকে তালিকা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের তোলার পর অন্য ছাত্রদের তুলতে বলা হয়েছে। এ ধরনের খবরদারি তাঁরা আগে দেখেননি। এ বিষয়ে তাঁরা প্রভোস্ট কাউন্সিলরের সভায় তুলবেন।

প্রাধ্যক্ষের ‘অসহায়ত্বের’ বিষয়ে এই অধ্যাপক বলেন, তিনিও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সব প্রাধ্যক্ষই একরকম দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাঁরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এ বিষয়ে শক্ত হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দরকার।

default-image

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মহ্ববত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হল খোলার পরই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা হলে সিট দখলে নেমে পড়েছেন। তাঁরা হল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিজেরা নিয়েছেন। এভাবে চলতে পারে না। এভাবে চললে একসময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে সিটই পাবেন না।

এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, হলে টাকার বিনিময়ে সিট দখল করার কথা তাঁরা জানেন না। এ বিষয়ে তিনি ও তাঁর সভাপতির সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক মো. জুলকার নায়েন বলেন, তাঁরা নিয়মিত প্রাধ্যক্ষ পরিষদের সভা করেন। সেখানে অনেকগুলো অ্যাজেন্ডা থাকে। এ বিষয়ে কথা বলতে হলে সরাসরি আসতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গোলাম সাব্বির সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, প্রাধ্যক্ষদের এ বিষয়ে শক্ত হওয়ার নির্দেশনা আগে থেকেই দেওয়া হয়েছে। তিনি বুঝতে পারছেন না তাঁরা কেন এ ব্যাপারে শক্ত হচ্ছেন না। তিনি এ বিষয়ে প্রাধ্যক্ষদের ডাকবেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন