default-image

একেক করে বিজিবি চেকপোস্ট পার হয়ে কাস্টম চেকপোস্টে এসে থামছে ভারতীয় ও ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাক। সেখানে চালকেরা নেমে জমা দিচ্ছেন কাগজপত্র। এরপর পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে প্রবেশ করছেন বন্দরের ভেতরে। সেখানে গাড়ি রেখে বন্দর কার্যালয় এলাকায় এলোমেলোভাবে ঘুরছেন ভারত ও ভুটান থেকে আসা চালকেরা। মিশছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, বন্দর শ্রমিক ও চালকদের সঙ্গে। কেউ কেউ আবার চা খেতে যাচ্ছেন বন্দর এলাকার ছোট ছোট হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেছে। এ স্থলবন্দর এলাকায় বাংলাদেশি ও বিদেশি চালকদের পাশাপাশি অন্য লোকজনের কাছে মাস্ক থাকলেও অনেকেরই তা ঠেকেছে থুতনিতে। কেউবা রেখেছেন পকেটে। যেখানে–সেখানে জটলা বেঁধে দিচ্ছেন আড্ডা। প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার পাল্লা দিয়ে বাড়লেও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে তেমন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় পুরো পঞ্চগড় জেলা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে কোনো পণ্যবাহী ট্রাক দেশে প্রবেশ করামাত্রই তাতে জীবাণুনাশক স্প্রে করার পাশাপাশি চালকদের স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানাতে বাধ্য করা হচ্ছে। যদিও আজ মঙ্গলবার বেলা ৩টায় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের শূন্যরেখায় গিয়ে দেখা যায়, ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাকগুলোতে কোনো প্রকার জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনার সংকটে গত বছরের ৩০ মার্চ বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন দিয়ে মানুষ পারাপার বন্ধ করে দেয় সরকার। তবে ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকলেও শর্ত সাপেক্ষে ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থী এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ভারতে যাতায়াত করতেন। তবে কোনো বাংলাদেশি এই বন্দর দিয়ে ভারতে যেতে পারতেন না। এবার করোনার সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় আবার গতকাল সোমবার থেকে এই ইমিগ্রেশন দিয়ে মানুষ পারাপার একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

default-image

ইমিগ্রেশন পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের লকডাউন শুরুর পর গত ৩০ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের ১৬৫ জন নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এ ছাড়া এই পথে ৩৫২ জন ভারত ও নেপালের নাগরিক ভারতে গেছেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ইমিগ্রেশন বন্ধ থাকলেও স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে চলছে পণ্য আমদানি-রপ্তানি। গতকাল এই বন্দর দিয়ে ২১৭টি ট্রাকে ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে পাথর, চাল ও গম আমদানি হয়েছে। এ ছাড়া এদিন বাংলাদেশ থেকে ভারত, নেপাল ও ভুটানে ৬২টি ট্রাকে সয়াবিন, ব্যাটারি ও অন্য মালামাল রপ্তানি হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা তিনটা পর্যন্ত এই বন্দর দিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে ১৮৪টি ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্য নিয়ে ৩৯টি ট্রাক ভারতে প্রবেশ করেছে।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিডেট কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি চালকেরা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি থেকে নামবেন না এবং দ্রুত পণ্য খালাস করে আবার ফেরত যাবেন, এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সময় তাঁদের মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জন্য পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ বন্দর এলাকায় ঘোরাফেরা, মানুষের সঙ্গে না মিশতে মাইকিং করা হচ্ছে।

তবে দুপুরে বন্দর এলাকায় ঘুরে এসবের কোনো কিছুই দেখা মেলেনি। এ ছাড়া পণ্যবাহী গাড়িগুলোতে জীবাণুনাশক ছিটানো (স্প্রে), চালকদের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ এবং তাঁদের হ্যান্ড স্যানিটাইজ করার কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি।

আমরা ভারতীয় চালকদের মাস্ক ছাড়া বন্দরে ঢুকতে দিচ্ছি না। তাঁদের শারীরিক দূরত্ব মানার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও অনেকে কথা শুনছেন না।
আবুল কালাম আজাদ, ইনচার্জ, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেড

ভারতীয় ট্রাকচালক নওশাদ আলী (৪৪) বলেন, ‘আমরা ভারত থেকে আসার সময় সেখানে গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করেছে। তবে বাংলাদেশে আসার পর এখানে করা হয়নি। কারপাসসহ অন্য কাগজপত্র দেখানোর জন্য তো নামতে হবেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাস্টমের একজন কর্মচারী বলেন, গত বছর এখানে স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন ছিলেন। সবার শরীরের তাপমাত্রাসহ অন্যান্য বিষয় দেখভাল করতেন। এবার সেই ব্যবস্থা নেই। ভারতের যে অবস্থা শুনছেন, তাতে সবাই ঝুঁকিতে আছেন। ওই কর্মচারী বলেন, ‘আমরা শুনেছি, শুধু জরুরি পণ্য আসবে। এখন তো দেখছি পাথরই বেশি আসছে। এই এলাকার মানুষ, তথা দেশের কথা চিন্তা করে এখানে স্বাস্থ্যবিধি আরও কঠোরভাবে মানানো উচিত।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবির এক সদস্য বলেন, এখানে ভারত থেকে পণ্য নিয়ে ঢোকামাত্রই প্রতিটি ট্রাকে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়। তবে আজ (মঙ্গলবার) যে ছেলেটি স্প্রে করে, সে একটু অসুস্থ থাকায় সাময়িক বন্ধ আছে।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা ভারতীয় চালকদের মাস্ক ছাড়া বন্দরে ঢুকতে দিচ্ছি না। তাঁদের শারীরিক দূরত্ব মানার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও অনেকে কথা শুনছেন না। আমরা তাঁদের স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহাগ চন্দ্র সাহা বলেন, ভারতে সংক্রমণ বাড়ায় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে, বিশেষ করে বিদেশি চালকদের বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখানে সবার কাছেই মাস্ক আছে। তবে কেউ থুতনিতে, কেউ পকেটে আর কেউবা মানিব্যাগে রাখছেন। মাস্ক পরানোসহ স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। এর আগে সোমবার স্বাস্থ্যবিধি না মানায় দুজন বাংলাদেশি চালককে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ভারতীয় ট্রাকে উঠে পাথর কোয়ারিতে যাওয়ার জন্য ২৬ জন শ্রমিককে তিন দিন বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন