সকাল সাড়ে ৮টায় ইউএনও শুক্লা সরকার প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে অন্তত দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক বন্দর ঘাট পারাপার হন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘাট পারাপার নিশ্চিত করতে সব ট্রলার ও নৌকা চালু রাখা হয়েছে।

বন্দরের তিনগাঁও এলাকা থেকে পোশাক কারখানার শ্রমিক রেশমি আক্তার বলেন, নগরের করিম মার্কেট এলাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানায় তিনি কাজ করেন।

প্রতিদিন কারখানায় যেতে অটোরিকশা ও ট্রলার ভাড়া মিলে ১৭ টাকা খরচ হয় তাঁর। আজ অটোরিকশা বন্ধ থাকায় ও রিকশায় একাধিক যাত্রী উঠতে না দেওয়ায় কারখানায় যেতে তাঁর খরচ হয়েছে ৫২ টাকা।

বন্দর ঘাট এলাকার একটি হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিক রাবেয়া বেগম। তিনি বলেন, ফতুল্লার সস্তাপুর থেকে প্রতিদিন লেগুনায় ও হেঁটে কাজে আসেন তিনি। এতে তাঁর খরচ হয় ১০ টাকা। লেগুনা না পেয়ে দুজন মিলে রিকশা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কারখানা পর্যন্ত ২০০ টাকা ভাড়া চাওয়ায় পরে হেঁটেই রওনা হন।

default-image

কর্মস্থলে যেতে এমন ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন পোশাক কারখানার শ্রমিক মাহফুজা, আসমা, মাহফুজ, করিমসহ অন্তত ১৩ জন। সকাল ১০টায় চাষাঢ়া মোড়ে সন্তানসম্ভবা এক নারীকে ভ্যানগাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়। দীপা রানী রায় নামের ওই নারীর স্বামী দীপঙ্কর রায় বলেন, ফতুল্লার লালপুর থেকে নগরের কালীর বাজারের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে এসেছেন তাঁরা। আজ ভোরে প্রসবব্যথা শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রাইভেট কার কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা জোগাড়ের চেষ্টা করেছেন। না পেয়ে বাধ্য হয়ে ভ্যানে করেই স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন।

এদিকে নগরের বন্দর বাজার, কালীর বাজার, ১ নম্বর রেলগেট, ২ নম্বর রেলগেট, নিতাইগঞ্জ, ডিআইটি, চাষাঢ়া, খানপুর এলাকাগুলোতে জরুরি প্রয়োজনীয় দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকান ও মার্কেট বন্ধ ছিল। শহরের খাবার হোটেলগুলো খোলা থাকলেও কোনো ক্রেতা হোটেলে বসে খাবার খেতে পারেননি। তবে নিতাইগঞ্জ এলাকার দুটি খাবার দোকান ও বেশ কিছু চায়ের দোকানে একসঙ্গে বসে সেখানকার শ্রমিকদের খাবার খেতে দেখা গেছে। সকাল থেকেই নিতাইগঞ্জের পাইকারি দোকানগুলোয় স্বাভাবিক নিয়মেই কেনাবেচা হয়েছে। শীতলক্ষ্যা পাড়ের ৩ নম্বর ঘাট মাছ বাজার ও নগরের দিগুবাবুর বাজারে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সক্রিয়তা দেখা গেছে। চাষাঢ়া মোড়ে থাকা চেকপোস্টগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি রেড ক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউটের স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করেন। তাঁরা বিভিন্ন ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালক এবং যাত্রীদের মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে তৎপরতা চালিয়েছেন।

এ সময় স্বাস্থ্যবিধি না মানায় অন্তত ১০টি গাড়ি আটকে দেওয়া হয়েছে।

সৈয়দপুরের ফকিরবাড়ি থেকে আসা শ্রমিক জাকির হোসেন বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ পাঠানটুলির একটি কারখানায় কাজ করেন তিনি। অটোরিকশা করে ফকিরবাড়ি থেকে দ্বিগুণ ভাড়ায় শহরের ডিআইটি আসার পথে পুলিশি বাধায় অর্ধেক রাস্তায় নেমে যেতে বাধ্য হন। বাকি পথ হেঁটে ডিআইটি থেকে কারখানার বাসে ওঠেন। সেই বাস থামিয়ে দেওয়া হয় চাষাঢ়ায়।

default-image

কারখানা খোলা রেখে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন জাকির। তিনি বলেন, ‘আমাদের বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে, হেঁটে যেতে হচ্ছে, কারখানার বাস থামিয়ে পথে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। করোনা মোকাবিলা করতে হলে আমাদের বেতনসহ ছুটি দেওয়া হোক, না হয় সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিবহনের ব্যবস্থা করা হোক। আমরা এভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে চাই না। তাঁরা কেন ভুলে যায়, আমাদেরও জীবনের ভয় আছে, পরিবার আছে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, বিধিনিষেধ কার্যকর করতে জেলাজুড়ে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ২০টি দল, পুলিশের ৩১টি দল, সেনাবাহিনীর ৫টি দল ও ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন