বিজ্ঞাপন

লতা বেগম বলেন, ‘কিছু হাঁস-মুরগি পালতাম। মঙ্গলবার দিন রাতি হঠাৎ পানি উঠে খোপ-পোট তলায় সেগুলো মরে গেছে। স্বামীটা তিন মাস ধরে অসুস্থ। একখান ভ্যান ছিল বেইচে অপারেশন করাইছি। ছোট দুটে বাচ্চা আছে, আমরা না হয় না খাইয়ে থাহি। ওগো রে কী করি কন?’

রুনু বেগম সম্পর্কে লতার স্বামী ফয়সাল মোল্লার ফুফু। ৩০ বছর আগে ভৈরবের ভাঙনে উদ্বাস্তু হয় তাঁদের পরিবার। ভৈরব নদের অপর প্রান্তে গোপালকাঠি এলাকায় ছিল তাঁদের বসবাস। এখন তাঁদের ঠাঁই হয়েছে মাঝিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পে। সরকারের কাছ থেকে পাওয়া এখানের এক খণ্ড জমি তাঁদের দুঃখ ঘোচাতে পারেনি বরং নতুন করে আবারও সব হারানোর শঙ্কা।

default-image

বাঁধ না থাকায় প্রতিবছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে কয়েকবার ডুবতে হয় তাঁদের। বলছিলেন, তিন দিন হলো চুলা জ্বলে না। অনেকটা না খেয়েই থাকতে হচ্ছে।

‘চুলো ভাঙ্গে গেছে, কাঠপাট কিছু শুগনো নেই। খাওয়াদাওয়া নেই, গোছল নেই। আমরা কী করে বাঁচপো? কীভাবে চলবো? কীভাবে খাবো? গত দিন পরিষদ থেকে কয়ডা চিড়ে আর চিনি দিয়ে গেছিল। তাই খাইয়ে আছি দুজন’, বলেন রুনু বেগম। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হওয়াতে স্বামী–স্ত্রী দুজনে এখানে থাকেন। বাড়ির সামনে তাঁর স্বামী মোশারফ হোসেনের ছোট মুদিদোকান।

ঘর ডুবছিল তিন দিন ধরে। আজ পানি বেড়েছে আগের দিনের চেয়েও বেশি। তলিয়ে গেছে দোকানটিও। মোশারফ হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর একটার পর একটা ঝড়, আমাদের দুঃখ–কষ্ট ভোগ করতি হয়। কিন্তু সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই বাঁধ দেওয়ার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘আরা ডুবে গেলি ইউএনও আসে, চেয়ারম্যান-মেম্বার আসে, দেখা যায় এক কেজি দেড় কেজি মুড়ি দেয়। এই দিয়ে যে চলে যায়, আর কোনো দিন আসে না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, আমাদের বাঁচাতি চালি এখানে একটা বাঁধ করে দেন।’

মোশারফের সঙ্গে কথা বলে কিছু দূর এগোলে আরও কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। সবার দুর্ভোগের চিত্র একই রকম। আধা ঘণ্টা যেতে আরও এক ফুটের মতো পানি বেড়েছে। ফেরার পথে দেখা যায়, মোশারফ হোসেনের দোকানে নিচের অংশ তলিয়ে গেছে। সেই পানির মধ্যেই চোখে–মুখে চিন্তার গভীর ছাপ নিয়ে বসে আছেন।

default-image

এরই মধ্যে ডাক আশপাশের বাড়ি থেকে। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে তাঁদের ঘরে থাকা ফ্রিজটি। ঘরের পুরুষ লোক কাজে যাওয়ায় প্রতিবেশী আরেক তরুণকে নিয়ে দ্রুত গিয়ে ইট দিয়ে প্রথমে ঘরের খাট উঁচু করেন তাঁরা। পরে ফ্রিজটি সেই খাটে তুলে দেন তাঁরা। তবে রক্ষা করা যায়নি পাশের ঘরের আনোয়ার দম্পতির ফ্রিজটি। বাড়িতে কেউ না থাকায় ফ্রিজের নিচের দিকের প্রায় দেড় ফুট তলিয়ে গেছে পানিতে। তলিয়ে গেছে অন্য মালামালও।

বাইরে পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাপসহ বিষধর প্রাণী। শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন এখানকার পরিবারগুলো। ঘরের মধ্যেও পাওয়া যাচ্ছে সাপ-বিছে। লতা বেগম বলছিলেন, ‘গেল রাতে বিছনা গুছাতে গিয়ে দুডো বিছে পাইছি খাটের ওপর। ওরাও বাঁচার আশ্রয়ে ঘরে আইসে উঠিছে। কিন্তু দুটে ছোট বাচ্চা ঘরে। কেমন ভয় লাগে বলেন?’

পানিতে এই আশ্রয়শিবিরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বুধবারের জোয়ারের তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে রাস্তার কার্পেটিং, খোয়া। এই রাস্তাসহ জেলা এলজিইডির আওতাধীন অন্তত ২০টি সড়কের ছোট–বড় ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে মোরেলগঞ্জ উপজেলা দুটি রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এলজিইডি বাগেরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম মুজিবর রহমান।
এদিকে সওজ বাগেরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ফলে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে সাতটি সড়কের বিভিন্ন অংশে প্রায় ১৩ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জোয়ারের সময় বাদে এসব সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তীব্র স্রোতে জোয়ারের সময় মোংলা ও মোরেলগঞ্জের ফেরি দুটি বন্ধ রাখছেন। পানির চাপ কমলে দ্রুতই আমরা সড়কগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামতকাজ শুরু করব।’

default-image

জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে জেলার ২ হাজার ৯১টি মৎস্যঘের। মৎস্য বিভাগের বাগেরহাট কার্যালয়ের বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা (ডিএফও) এ এস এম রাসেল জানান, বাগেরহাটের রামপাল, মোংলা, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা—এই চার উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ২ হাজার ৯১টি মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে চাষিদের ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, গতকাল ঝড়ের দিনের চেয়েও বৃহস্পতিবার দুপুরের জোয়ারে এক ফুট বেশি পানি হয়েছে। মূলত মঙ্গলবার রাত থেকে দিনে–রাতে দুইবার জোয়ারের পানিতে ডুবে যাচ্ছে জেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো। বাঁধ না থাকা এলাকাগুলোর মতো শরণখোলা, রামপাল, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলার নদীতীরবর্তী কয়েকটি এলাকায় রিং বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে বহু ঘরবাড়ি ও মাছের ঘের।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন