বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

আমই ‘রাজা’

দেশে যেসব ফল উৎপাদিত হয়, তার মধ্যে বেশি ফলে আম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদিত হয়েছে ১২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদনের দিক দিয়ে শীর্ষ পাঁচ ফলের মধ্যে আমের পরে রয়েছে কাঁঠাল (প্রায় ১১ লাখ টন), কলা (প্রায় ৮ লাখ টন), তরমুজ (প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন) ও পেয়ারা (প্রায় আড়াই লাখ টন)।

বিবিএসের হিসাবের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উৎপাদনের তথ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, দেশে আম উৎপাদিত হয় ২৪ লাখ টনের বেশি। বছরে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হয়। ফলটি দেশের মানুষের পুষ্টির অন্যতম উৎস।

দেশে প্রতিবছর মে মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়কে আমের মৌসুম হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে আগস্ট মাসেও কিছু কিছু আম পাওয়া যায়। আর কিছু বাগানে বারোমাসি আম চাষ শুরু হয়েছে। ডিএইর হিসাবে, এখন দেশে উৎপাদিত আমের ৩০ শতাংশ আম্রপালি বা বারি-৩ জাতের আম। এরপর রয়েছে হিমসাগর ২০ শতাংশ, আশ্বিনা ১০ শতাংশ, গোপালভোগ ৪ শতাংশ এবং গোবিন্দভোগ ও ফজলি ৩ শতাংশ। বাকিটা অন্যান্য জাতের আম। দেশে ৮০০টির বেশি আমের জাত রয়েছে।

এ মৌসুমে বাজারে পাকা আম আসতে শুরু করেছে। ঢাকার বাজারে গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ আম ১১০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। কিছুদিনের মধ্যেই বাজারে আসতে শুরু করবে হিমসাগর/ক্ষীরশাপাতি আম।

বিভিন্ন কারণে এবার জেলায় আম উৎপাদন কম হবে।
নূরুল ইসলাম, জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক

চার জেলার পরিস্থিতি

নওগাঁর আমবাগানের মালিক ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় এবার মুকুল থেকে আমের গুটি হওয়ার সময় তীব্র দাবদাহ ছিল। বৃষ্টি হয়নি। এ কারণে আমের আকৃতি ছোট হয়েছে। আবার পোকার আক্রমণ ও গত এপ্রিলে কয়েক দফা কালবৈশাখীতে গাছের আম কিছু ঝরে পড়েছে। সব মিলিয়ে জেলায় আমের উৎপাদন গতবারের তুলনায় কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার তিলনা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম আট বছর ধরে আম চাষ করেন। এ বছর তাঁর বাগানে জমির পরিমাণ ১৭৫ বিঘা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গেলবারের তুলনায় এবার আমগাছে মুকুল এসেছিল বেশি। কিন্তু অনাবৃষ্টির কারণে এবার আমের গুটি ব্যাপক হারে ঝরে যায়। এ ছাড়া আম পরিপক্ব হওয়ার সময় পর্যাপ্ত পানি পায়নি। এতে আকার কিছুটা ছোট হয়েছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জেলায় এবার প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর বেশি। উৎপাদনের লক্ষ্য ৪৯ হাজার টন বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টন। জেলাটির কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ বলেন, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে কিছুটা বেশি। আমের উৎপাদন লক্ষ্যও সামান্য বাড়িয়ে ২ লাখ ১৭ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজশাহীতে গত বছরের চেয়ে আমের মুকুল কম এসেছে। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, ছোট গাছে আম বেশি আসে। এ কারণে বড় গাছে মুকুল কম হলেও উৎপাদনের লক্ষ্য গত বছরকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। কৃষকেরা এতটা আশাবাদী নন। তাঁরা বলছেন, এবার ফলন কম হবে। তবে দাম ভালো পাওয়ার আশা রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, এবার জেলায় ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। মুকুল কম আসার কারণে এবার উৎপাদন লক্ষ্য ২০ হাজার টন কমিয়ে ৩ লাখ ১৫ হাজার টন ধরা হয়েছে। জেলাটির শিবগঞ্জ উপজেলার কলেজশিক্ষক ও আমচাষি মো. ইউসুফ আলী প্রথম আলোকে বলেন, এবার ফলন কম হবে।

মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আসে সাতক্ষীরার আম। জেলাটির কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় ৪ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪০ হাজার টন। গত বছর একই পরিমাণ জমিতে আম উৎপাদিত হয় প্রায় ৫৪ হাজার টন।

সাতক্ষীরা শহরতলির কুকরালি এলাকার আমচাষি মোকছেদ আলী মোড়ল প্রথম আলোকে জানান, তাঁর ১৪টি আমবাগানের আয়তন ৭০ বিঘা। ১৪ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন। চলতি মৌসুমে ৭০ ভাগ হিমসাগর জাতের আমের গাছে মুকুল আসেনি। ফলে লোকসানে পড়েছেন তিনি।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় অশনির ভয়ে সাতক্ষীরার আমচাষিদের অনেকে আম আগেই পেড়ে ফেলেছেন। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন কারণে এবার জেলায় আম উৎপাদন কম হবে।

‘অফ ইয়ার’ কেন

আমের উৎপাদন যে বছর কম হয়, সে বছর দাম সাধারণত বেশি হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, বছর-বছর আমের দাম বেশ ওঠানামা করে। যেমন ল্যাংড়া আমের জাতীয় গড় খুচরা দর ২০১৬ সালে ছিল ৫৬ টাকা কেজি, যা পরের বছর ৭৪ টাকায় উঠে যায়। ২০১৮ সালে অবশ্য দর কিছুটা কমে ৬৯ টাকায় নামে। পরের দুই বছরের গড় দাম ছিল যথাক্রমে ৮১ ও ৮০ টাকা।

ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এ রহিম মনে করেন, এক বছর বেশি ও পরের বছর ফলন কম হওয়ার কারণ যত্নের অভাব। তিনি বলেন, যেবার উৎপাদন বেশি হয়, সেবার গাছের প্রচুর খাদ্যচাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার এসব গাছ পায় না। ফলে পরের বছর ফলন কম হয়।

দেশে একটি লাউগাছ লাগালে মানুষ যত যত্ন নেয়, বাড়ির আম-জাম-কাঁঠালের ক্ষেত্রে তা নেয় না উল্লেখ করে অধ্যাপক এম এ রহিম বলেন, যত্ন নিলে একান্তরিক ফলনের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা যাবে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহীসাতক্ষীরা এবং প্রতিনিধি, নওগাঁ]

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন