default-image

২০০৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বগুড়ায় ছয়টি হত্যা মামলা বেশ আলোচিত হয়। এগুলোর প্রতিটিতে ভুক্তভোগীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ তোলেন বাদীরা। ওই ছয় মামলার আসামিরাই এবার বগুড়া পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। ছয় ঘটনার অভিযুক্তরাসহ মোট প্রার্থীর ১৯ জনই হত্যা মামলার আসামি।

নির্বাচনে মেয়র-কাউন্সিলর পদে মোট প্রার্থী ১৮৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৬৩ জনের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন মামলা আছে। হত্যা ছাড়াও অস্ত্র মামলার আসামি ৯ জন। বাকিরা হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, মারামারি, প্রতারণা ও ভাঙচুর, নাশকতা এবং নারী নির্যাতন মামলার আসামি।

হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন এমন প্রার্থীদের মধ্যে চারজন আওয়ামী লীগের ও দুজন বিএনপির সমর্থন পেয়ে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। হত্যা মামলার বাকি আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও দলীয় সমর্থন পাননি। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এবং জেলা পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি বগুড়া পৌরসভা নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

বিজ্ঞাপন

মেয়র পদে চারজন প্রার্থীর মধ্যে দুজন হলফনামায় মামলার তথ্য উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে বিএনপি মনোনীত রেজাউল করিম বাদশা হলফনামায় হত্যাসহ পাঁচটি মামলা বিচারাধীন এবং হত্যাসহ আটটি মামলায় খালাস, অব্যাহতি ও প্রত্যাহারের তথ্য দিয়েছেন। ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর শহরের সাত মাথায় যুবদলের ১ নম্বর ওয়ার্ড আঞ্চলিক কমিটির সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আরিফুল শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রেজাউল করিম এই মামলার আসামি।

মেয়র পদের অপর প্রার্থী (স্বতন্ত্র) আবদুল মান্নান আকন্দ বিস্ফোরক আইনে মামলা থাকার তথ্য দিয়েছেন। আবদুল মান্নান আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। তিনি বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। বগুড়া জেলা ট্রাক, ট্যাংকলরি ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতিও তিনি।

খুন, অস্ত্রসহ বিভিন্ন মামলার আসামিদের দলীয় সমর্থন দেওয়া প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এ কে এম আসাদুর রহমান বলেন, বিতর্কিত ব্যক্তিকে সমর্থন দেওয়াটা দলের ভাবমূর্তির জন্য ভালো হয়নি। কাউন্সিলর পদে দলীয় সমর্থন দিয়েছে শহর আওয়ামী লীগ। তারা জেলা কমিটির কোনো পরামর্শ নেয়নি। আর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম মো. সিরাজ বলেন, বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, সেগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় করা। ত্যাগী ও জনপ্রিয়দেরই সমর্থন দিয়েছে দল।

আসামি বেশি ওয়ার্ডে

পৌরসভার সাধারণ ২১টি ওয়ার্ডের ১৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৫ জন হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। সংরক্ষিত ৭টি ওয়ার্ডে ৫০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা আছে। তাঁদের মধ্যে ২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী হয়েছেন মারজিয়া হাসান। তিনি আলোচিত শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকারের স্ত্রীর বড় বোন। ২০১৭ সালে ছাত্রী ধর্ষণ ও মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার মামলার আসামি তিনি।

এ ছাড়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডে মাজেদা বেগম হত্যা মামলার, ১ নম্বর ওয়ার্ডের জোবাইদা বেগম, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের শাহিনুর, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শিরিন আকতার ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রেহেনা বেগমের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি করে মামলা আছে। শাহিনুর, শিরিন ও রেহেনা বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন।

সাধারণ ওয়ার্ডে আলোচিত মামলার আসামিদের মধ্যে ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত নুরুল ইসলাম (টিউবলাইট)। তিনি ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। হলফনামায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ সাতটি মামলা বিচারাধীন আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের পুরোনো ভবন এলাকায় সংঘর্ষে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের বাংলা বিভাগ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম হোসেন ছুরিকাঘাতে নিহত হন। নুরুল ইসলাম এ হত্যা মামলার প্রধান আসামি।

বিজ্ঞাপন
বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, সেগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় করা। ত্যাগী ও জনপ্রিয়দেরই সমর্থন দিয়েছে দল।
গোলাম মো. সিরাজ, আহ্বায়ক, জেলা বিএনপি

৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী হয়েছেন জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটির সহসভাপতি আলহাজ শেখ (উটপাখি)। গত বছরের ৫ জুন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি আলহাজ শেখ। হলফনামায় ৬টি মামলার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। হত্যাসহ তিনটি মামলায় খালাস পাওয়ার কথা জানিয়েছেন হলফনামায়।

একই ওয়ার্ডে প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর ও জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাকিম রহমান। হলফনামায় একটি হত্যাসহ ছয়টি মামলার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১২ সালে শহর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক সুজানুর রহমান হত্যা এবং ২০১৮ সালে পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালককে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টাসহ তিনটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।

সাধারণ ওয়ার্ডগুলোতে আলোচিত অন্য আসামিদের মধ্যে আছেন ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আরিফুর রহমান, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে মেজবাহুল হামিদ, ২০ নম্বর ওয়ার্ডে জামিল উদ্দিন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আনন্দ কুমার দাস, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে আলোচিত তুফান সরকারের বড় ভাই আবদুল মতিন সরকার ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে আমিনুল ইসলাম। তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগ–সমর্থিত। আমিনুল ইসলাম ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুল আলমকে কুপিয়ে হত্যা মামলার আসামি।

অন্যদিকে বিএনপির সমর্থন পাওয়া আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে আছেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দেলওয়ার হোসেন, ১১ নম্বর ওয়ার্ডে সিপার আল বখতিয়ার, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে হোসেন আলী, ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে মাসুদ রানা ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে হারুন উর রশিদ। এসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াত–সমর্থিত এরশাদুল বারী তিনটি হত্যাসহ ৫১টি মামলার আসামি। তিনি শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের জেলা কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। এই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরও তিনি। ২০১২ সালে শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আশিস কুমার ও ২০১৩ সালে বগুড়ায় গণজাগরণ মঞ্চের নেতা জিয়াউদ্দিন জাকারিয়াকে কুপিয়ে হত্যা মামলার আসামি তিনি। ২১ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াত–সমর্থিত আরেক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস চারটি মামলার আসামি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন