default-image

কাবিলের জীবনটা সংগ্রামের

কাবিল হোসেনের পারিবারিক গল্পটা সংগ্রাম আর বেদনার। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের যমুনা নদীর দুর্গম দক্ষিণ দীঘলকান্দি চরের হতদরিদ্র ভূমিহীন মোজাহার আলীর চার ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। মা কোহিনুর বেগম গৃহিণী। বড় দুই ভাই স্নাতক শ্রেণিতে পড়ছেন। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর অর্থাভাবে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে ছোট বোনের। নদীভাঙন আর বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিঃস্ব পরিবার।

জন্মান্ধ কাবিল জানান, শৈশবে আলোহীন চোখে দৃষ্টি ফেরাতে চিকিৎসার তেমন কোনো সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। ২০০৯ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী অন্ধদের স্কুলে ভর্তির কথা বলেন। তাঁর সহযোগিতায় কালাইয়ের সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষাকার্যক্রমের আওতায় পুনট উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। সেখানে আবাসিক ছাত্র হিসেবে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৯ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পান।

এরপর কাবিল চলে আসেন বগুড়ার সুলতানগঞ্জ সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষাকার্যক্রম কেন্দ্রে। সেখানে আবাসিক ছাত্র হিসেবে থেকে পড়ালেখা করেন বগুড়ার সরকারি শাহ সুলতান কলেজের মানবিক বিভাগে। এবারও পান জিপিএ-৫। কাবিল বলেন, ‘মনের আলো দিয়ে সুন্দর পৃথিবীকে জানতে চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো কোনো বিষয়ে পড়তে চাই। পড়াশোনা শেষে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার স্বপ্ন আছে।’

default-image

আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন জিসানের

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার পৌর এলাকার উৎরাইল মহল্লার দিনমজুর তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে জিসান হোসেন। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট সে। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করেন। মা জাহানারা বেগম গৃহিণী। সহায়সম্বল বলতে আড়াই শতাংশের একখণ্ড বসতভিটা।

আকাশছোঁয়া স্বপ্ন জয়ের অদম্য ইচ্ছা জিসানের। এবারের এসএসসিতে বগুড়ার সুলতানগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। ভর্তি হয়েছে রাজধানীর ঢাকা কলেজে। জিসানের এ সাফল্যে পরিবার যেমন খুশি, আছে দুশ্চিন্তাও। তার পড়াশোনার খরচ আসবে কোথা থেকে তা ভেবে কূল পাচ্ছেন না তাঁরা।

জিসান জানায়, জন্ম থেকে দুই চোখে আলো নেই তার। শৈশবে অস্ত্রোপচার করা হয় দুই চোখে। লেন্স লাগানোর পর দুই চোখে আলো ফিরে আসে, কিন্তু তা ঝাপসা। সেই আলোয় বইয়ের পাতার লেখা পড়া যায় না। দুই হাত দূরের কোনো কিছু দেখাও যায় না। শৈশবে অন্যের পড়া শুনে বর্ণমালা শেখায় হাতেখড়ি নিজ গ্রামে ব্র্যাক স্কুলে। এরপর মা-বাবা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন পুনট সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষাকার্যক্রম কেন্দ্রে। সেখান থেকে জেএসসিতে জিপিএ-৫ পায় জিসান। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয় বগুড়ার সুলতানগঞ্জ সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষাকার্যক্রম কেন্দ্রে। সেখানকার আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে সুলতানগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। মানবিক বিভাগ থেকে পায় জিপিএ-৫।

জিসান বলে, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় মাঝেমধ্যে খারাপ লাগে। হতাশা পেয়ে বসে। তবে থেমে যাইনি। বাবা-মায়ের উৎসাহে এগিয়ে গেছি। তবে ভালো ফল করেও হতাশা পিছু ছাড়েনি। ঢাকা কলেজে ভর্তির সুযোগ হয়েছে। কিন্তু এখনো ভর্তি হওয়া এবং সেখানে থাকা–খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। ভালো কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। তবে আশা ছাড়িনি। পড়ালেখা করে, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছি।’

default-image

অদম্য রবিন

আলোহীন দুই চোখ। পথ চলতে হয় অন্যের সহযোগিতায়। তবে স্বপ্ন দেখা থামাতে চায় না রবিন খান। বগুড়ার সুলতানগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সে। কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় এসএসসিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখানোর পর রবিন ভর্তি হয়েছে রাজধানীর ঢাকা কলেজে।

রবিন সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বাজার ভদ্রঘাট গ্রামের দিনমজুর সোলায়মান আলীর ছেলে। মা রুবিয়া খাতুন অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। পরিবারের সহায়সম্বল বলতে ৫ শতাংশের বসতভিটা। তিন ভাইবোনের সবার ছোট সে। বড় ভাই রুবেল হোসেন পেশায় গাড়িচালক। বড় বোন অন্তরা খাতুন সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়েন।

ছোটবেলা থেকেই এক চোখে আবছা দেখতে পারত রবিন। বইও পড়তে পারত, লিখতে পারত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় দুর্ঘটনায় ডান চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হলে দুই চোখ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে। তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। চোখের আলো হারালেও পড়াশোনা করার স্বপ্ন ধূসর হয়নি রবিনের। আত্মপ্রত্যয়ী এই কিশোরের ইচ্ছা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার।

রবিন বলে, ‘অজপাড়াগাঁয়ের সাধারণ পরিবার থেকে আলোহীন চোখে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। পড়ালেখা করে স্বপ্নপূরণের অদম্য ইচ্ছা থেকেই শৈশবে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পরিবার ছাড়াই বছরের পর বছর থেকেছি। এখন স্বপ্ন আরও এগিয়ে যাওয়ার। এতদূর যখন আসতে পেরেছি, স্বপ্ন ছুঁতেও আমি পারব, পারতেই হবে।’ ঢাকা কলেজে পড়ার খরচ জোগানোর মতো সামর্থ্য নেই তার পরিবারের।

বগুড়ার সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম কেন্দ্রের প্রধান আজিজুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, কাবিল, জিসান ও রবিন তিনজনই সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম কেন্দ্রের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিল। উচ্চশিক্ষার খরচ সংকুলান করার সামর্থ্য নেই তার পরিবারের।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন