বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘আজকে ভাব ভালো না’ বলে ফের ট্রলির ওপর বসে পড়লেন ফজলু শেখ (৭২)। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থেকে খুলনা এসেছেন তিনি। সেই ঘটনা কত বছর আগের তা ঠিকঠাক মনে নেই ফজলুর। তবে যখন খুলনায় এসেছেন, তখন শহরে চালের সের ছিল চার আনা-পাঁচ আনা। এখন থাকছেন নদীর ওপারে রূপসার শ্রীফলতলা ইউনিয়নের মোছাব্বারপুর গ্রামে। সেখান থেকে এখন রমজানের সময় রাত সাড়ে তিনটায় রওনা দেন। অন্য সময় ফজরের আজানের পর বের হন।

ফজলু বলেন, ‘সারা রাত খেয়া চলে। অন্য সময় তিন টাকা নিলেও অসময়ে পারাপারে দশ টাকা করে নিই। মোটামুটি সারা দিন স্টেশনে থাকি, বিকেল চারটার পর আর শহরে থাকি না। কোনো দিন আয় হয় চার শ টাকা, কোনো দিন আড়াই শ-তিন শ টাকা। আবার কোনো দিন একদমই হয় না।’

স্ত্রী-ছেলে-বউমা আর নাতিদের নিয়ে ছয়জনের সংসার ফজলুর। ছেলে একটা সাইকেল শোরুমে ছোট চাকরি করেন। কোনোমতে দিন চললেও বেশ কিছু অসুখ-বিসুখে আর্থিক দৈন্য পিছু ছাড়ছে না। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের দিকে একজন যাত্রীর ব্যাগ তুলে দেওয়ার জন্য দৌড়ে ট্রেন ধরতে গিয়ে চোখে রডের আঘাত লাগে। বছরখানেক পর সেই চোখ পুরো নষ্ট হয়ে যায়। এর কয়েক বছর পর প্রস্রাব থলিতে পাথর হওয়ায় অস্ত্রোপচার করা লেগেছে। পরে সেই জায়গায় সংক্রমণ ধরা পড়লে আবারও অনেক টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিয়েছেন। স্ত্রী বর্তমানে পক্ষাঘাতগ্রস্ত।

জীবনে বিভিন্ন রকমের কাজ করেছেন ফজলু। প্রায় ৩২ বছর ধরে স্টেশনে কুলির কাজ করছেন। অভাব–অনটনের পাশাপাশি এই বয়সে কাজ করায় ক্লান্তি আসে। এরপরও কাজ করাতেই মর্যাদা খুঁজে পান। ফজলু বললেন, ‘কর্ম করতে পারলে ভাত আছে। কান্ধে গামছা থাকলি ভাতের অভাব নেই। জীবনভর অনেক কর্মই করিছি। ভালোভাবে চলতি না পারলিও কারও কাছে হাত পাততি পারব না। না খাইয়ে থাকতি রাজি তবু। পৃথিবীর নিকৃষ্ট কাজ হাত পাতা। কেন কারও কাছে ৫ টাকা চাইব? কর্ম করে খাব।’

তবে বর্তমানের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ভীষণ নাখোশ ফজলু শেখ। তিনি বলেন, ‘সবকিছুর দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মানুষের চলবে কী করে? এক সময়ের ৩০ টাকার সয়াবিন এখন ১৯০ টাকা। বছর দশেক আগেও ৪০ টাকা কেজিতে ব্রয়লার নেওয়ার জন্য সাধাসাধি করেছে। অনেকে নেয়নি। সেই মুরগির দাম ১৮০-২০০ টাকা। তার ওপর ওই যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ডাবল হয়ে গেল। সেখান থেকেই কিন্তু দাম বাড়া শুরু। মরণ তো খেটে খাওয়া গরিব মানুষের।’

স্টেশনের প্রবেশ মুখে কুলি ভাড়াসংক্রান্ত তথ্য টানানো। সেখানে দেখা গেল, খুলনা রেলস্টেশনে রেলওয়ের পক্ষ থেকে মালামাল বহনের জন্য ট্রলি এবং প্রতিবন্ধী, প্রসূতি, রোগী ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ার সরবরাহ করা হয়েছে। সেখানে সর্বোচ্চ ২৮ কেজি ওজনের প্রতিটি ব্যাগের জন্য কুলি ভাড়া ২৫ টাকা। সর্বোচ্চ ৩৭ কেজি ওজনের ব্যাগের জন্য ৪০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫৬ কেজি ওজনের ব্যাগের জন্য ৫০ টাকা। ট্রলি, স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ারে যাত্রী টেনে নিয়ে গেলে ভাড়া ৩০ টাকা। কুলি টেনে নিয়ে গেলে সেই ভাড়া ৫০ টাকা।

ফজলুর পাশে বসা কুলি মো. রহমান (৬৭) আলাপে যোগ দেন। রহমানের বাড়ি ছিল ঝালকাঠির নলছিটি। তাঁর বয়স যখন এক সপ্তাহ, তখন বাবার সঙ্গে খুলনা আসেন। বুঝতে শেখার পর থেকে এখানেই কুলির কাজ করেন। ছয়জনের সংসার। থাকেন খুলনার ফুলতলাতে। সপ্তাহে একদিন বাড়িতে যান। বাকি ছয় দিন স্টেশনেই থাকা-খাওয়া–ঘুম সব।

মো. রহমান বলেন, ‘নতুন ঝকঝকা স্টেশন হয়েছে, পরিবেশও ভালো। তবে আগের চেয়ে ইনকাম কমছে। ছোটখাটো ব্যাগ যাত্রীরা নিজেরাই নিতে এখন পছন্দ করে। আর চলাচল চারদিকে হয়ে গেছে। এখন সবদিকেই বাস যায়। বিকল্প না থাকায় আগে মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করত। এখন মানুষের সময়ের দাম বেড়েছে।’ দিন কেমন যাচ্ছে জানতে চাইলে কিছুটা গম্ভীর হয়ে রহমান উত্তর দেন, ‘টানাটান তো থাকবেই। গরিবের সংসার। কাঁদলেও কেউ দেবে না, চাইলেও দেবে না। কাম কইরাই খাইতে হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন