default-image

করোনায় প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর লাখো মানুষ চাকরি ও কাজ হারিয়েছেন। দেশের বাইরে থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক কর্মী। কাজ হারিয়ে ফিরে আসা এসব অভিবাসী কর্মীর দেশে আয়ের কোনো উৎসও এখন নেই। এমন পরিস্থিতিতে মানব পাচার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও (এসএমই) আছে নানা সংকটে।

‘অর্থনৈতিক সংহতকরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন: বিদ্যমান এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনদের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে।

৩০ জুলাই বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে উইনরক ইন্টারন্যাশনাল, সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো–অপারেশনের (এসডিসি) আশ্বাস প্রকল্প ও প্রথম আলো যৌথভাবে এটি আয়োজন করে।

গত রোববার অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্যানেল আলোচকদের সঙ্গে বিভিন্ন খাতের ১৩০ জন অংশগ্রহণকারীও উপস্থিত ছিলেন।

করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও জনজীবন নিয়ে অনলাইন গোলটেবিলে আলোচনা করেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লাখো মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। মানব পাচার থেকে উদ্ধার ভুক্তভোগী ও কাজ হারিয়ে ফিরে আসা অভিবাসী কর্মীদের আয়ের কোনো উৎস নেই। আরও অনেক কর্মী দেশে ফিরে আসার শঙ্কায় আছেন। করোনায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এখন নানা রকম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছেন বলে মনে করছেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, যাঁরা বিদেশে চাকরি হারিয়েছেন, তাঁরা মানব পাচারের শিকার হতে পারেন। আবার যাঁরা মানব পাচার থেকে উদ্ধার হয়েছেন, তাঁরা আবারও মানব পাচারের শিকার হতে পারেন। এ ছাড়া মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে এমএসই খাত। ব্যাংক সহায়তাও নিতে পারছেন না তাঁরা।

গ্রামীণব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল মজিদ বলেন, সরকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণসহায়তা দিচ্ছে। প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তায় বেশ কিছু মডেল হাতে নিয়েছে সরকার। তবে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার পরিসর বাড়াতে হবে দেশে। এ ছাড়া নামমাত্র সুদে ঋণসহায়তা দিয়ে বেশি করে উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়াতে পারলে অর্থনীতি এগিয়ে যাবে।

তবে বেসরকারি সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ন্যাথালি শুয়ার্ড। তিনি বলেন, পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাড়া দিয়েছে। মানব পাচার থেকে উদ্ধার ও বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক সংহতকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বেসরকারি খাত।

সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত জানান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে এসডিসি। ঝুঁকিপূর্ণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। মানব পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া বিশেষ করে নারী ভুক্তভোগীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এসডিসি। ফিরে আসা অভিবাসী ও তাদের পরিবারকে সহায়তা দিতে এসডিসি কর্মসূচি নিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আশ্বাস প্রকল্পের প্রশংসা করে ন্যাথালি শুয়ার্ড বলেন, পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া ৪৮০ জনকে ৬০০ ঘণ্টার টেলিকাউন্সেলিং সেবা দিয়েছে আশ্বাস।

বক্তারা বলেন, এসএমই, অনানুষ্ঠানিক খাত ও ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের জন্য সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যদিও এ খাতে অর্থ ছাড় ‍খুবই কম। ঋণ নেওয়ার দক্ষতা নেই বলে মনে করছেন বক্তারা। তাঁরা বলছেন, ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। আর টিকে থাকার জন্য সরকারের অনুদান বা নগদ সহায়তা দরকার অনেকের।

ঋণ পেতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঢাকা চেম্বারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতে তিন লাখ কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হলেও ফিরে এসেছে চার বিলিয়ন ডলার। আগের বছর ৩৪ বিলিয়ন হলেও আগামী অর্থবছরে ২৭ থেকে ২৮ বিলিয়নের বেশি হবে না রপ্তানি আয়। এসএমই খাতে কর্মসংস্থান তৈরির অনেক সুযোগ আছে। এখানে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এর চাকা সচল হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন না থাকায় অনেকে ঋণসুবিধা নিতে পারছেন না বলে মনে করেন তিনি।

এর সঙ্গে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি বাংলাদেশের (নাসিবি) সভাপতি মির্জা নূরুল গণি শোভন। তিনি বলেন, ৭৬ লাখ এসএমইর মধ্যে ৬০ শতাংশ ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। দেড় থেকে দুই কোটি লোক বেকার। জমানো টাকা খাচ্ছে। সরকার এসএমই খাতে প্রণোদনা দিলেও ব্যাংক এ ঋণ বিতরণে ততটা আগ্রহী নয়। আর অনানুষ্ঠানিক খাতে ঋণ দিয়ে হবে না, অনুদান দিতে হবে। তাহলে ব্যবসা ফিরে আসবে।

বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, ব্যবসায়ীদের বিপদে ব্যাংক এগিয়ে আসে, না হলে ব্যাংক নিজেই ঝুঁকিতে পড়বে। সব ব্যাংকের এগিয়ে আসা উচিত। তবে দেশের সব জায়গায় এখনো ব্যাংক পৌঁছাতে পারেনি। প্রতিটি গ্রামে সেবা পৌঁছাতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ধরনের সামর্থ্য আছে, এটি কাজে লাগাতে হবে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএনসিআইডিআইএন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মাসুদ আলী বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারিত হচ্ছে না, নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। প্রবাসী কর্মীদের একটি বড় অংশ দেশে ফিরে আসছে। সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে।

ইউসেপ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক তাহসিনাহ আহমেদ বলেন, করোনায় ১ কোটি ৮০ লাখ লোক কাজ হারিয়েছে। আরও অনেকে কাজ হারানোর শঙ্কায় আছে। বাল্যবিবাহ, মানব পাচার, মাদকাসক্তি বাড়তে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তরুণেরা যাতে ব্যাংক ঋণ নিতে পারেন, তার জন্য সহজ শর্তে নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

তাহসিনাহ আহমেদ বলেন, দ্রুত মানবিক সহায়তা দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে উৎসাহ তৈরি করতে হবে, যাতে তাঁরা শিশুদের শিক্ষা চালিয়ে নিতে পারেন। অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এ সুবিধা পৌঁছাতে হবে।

আলোচনার শুরুতে আশ্বাস প্রকল্পের টিম লিডার দীপ্তা রক্ষিত বলেন, মানব পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের নিয়ে কাজ করে আশ্বাস। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী। যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করে ভুক্তভোগীদের উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করা হয়। করোনায় এটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা মেনে সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় সব ধরনের সরাসরি অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। ফলে যথাসময়ে প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা। এদের মোটামুটি সবাই অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন খাতে কাজ করে, আয় এখন কার্যত বন্ধ। নানা কারণে তাদের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

দীপ্তা রক্ষিত জানান, ‘আশ্বাস: মানব পাচার হতে উদ্ধারপ্রাপ্ত নারী ও পুরুষদের জন্য’ প্রকল্পটি মূলত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে মানব পাচার থেকে উদ্ধারপ্রাপ্ত ভুক্তভোগীদের কাউন্সেলিং ও আইনি সেবা প্রদান করে। এর পাশাপাশি তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছে। চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্প এসডিসির অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছে উইনরক ইন্টারন্যাশনাল।

প্যানেল আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কয়েকজন প্রশ্ন করে কিছু বিষয় জানতে চাইলে বক্তারা তাৎক্ষণিক উত্তর দেন।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তার মধ্য দিয়ে করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ হতে পারে বলে বক্তারা অভিমত দিয়েছেন গোলটেবিল আলোচনায়। তাঁরা বলেন, করোনা আসার আগে দেশের অর্থনীতি খুব ভালো অবস্থায় ছিল। অর্থনীতির চাকা আবার সচল করতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে বেসরকারি খাত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সংহতকরণ সম্পর্কিত। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে দিলে অর্থনীতির চাকাও ঘুরতে শুরু করবে।

বক্তারা পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যবসার ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে বেসরকারি খাত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করতে পারে। আর তারল্য একটি বড় বিষয়, তাঁদের হাতে নগদ টাকা থাকতে হবে। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে হবে। আর এসএমই খাতে ব্যাংক থেকে নয়, সরাসরি সরকার থেকে সহায়তা প্রয়োজন।

সব বক্তাই বলেছেন, যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি কমাতে হবে। চলমান খারাপ সময় পার হতে সবাই মিলে তাঁদের সহায়তা করতে হবে।

শুরুতে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গোলটেবিল আলোচনা শুরু করেন প্রথম আলোর যুব কর্মসূচির প্রধান মুনির হাসান। তিনি বৈঠক আলোচনা সঞ্চালনা করেন এবং সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0