লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চরবংশীতে নাজিমদের গ্রামের বাড়ি। চার ভাই-বোনের মধ্যে নাজিম সবার ছোট। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। মা লাইজু বেগম (৬৫) ও বোন সাদিয়া আক্তার কাজ করেন নারায়ণগঞ্জের খানপুর এলাকার একটি পাট বেলিং প্রেসে। সেখানে চার হাজার টাকা ভাড়ায় একটি টিনসেড ঘরে থাকে নাজিমরা।

আব্বা রাইতে দারোয়ান আর দিনে একটা মুদিদোকানে চাকরি করত। ইচ্ছা আছিল কোনো দিন টেকা হইলে একটা মুদিদোকান দিয়া দারোয়ানির চাকরিটা ছাইড়া দিব। সারা রাইত বাইরে বইসা থাকতে নাকি আব্বার অনেক কষ্ট হইত।
মো. নাজিম

গেল বছর নাজিমদের সঙ্গে তার বাবা আবুল খায়েরও ছিলেন। করোনার সময় নৈশপ্রহরী আবুল খায়েরের তিন দফায় স্ট্রোক হয়। দুই মাস হাসপাতালে থেকে তিনি মারা যান। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ করতে হয় নাজিমদের। বাবার মৃত্যু, ঋণের বোঝা, তার ওপর জিনিসপত্রের চড়া দর। বৃদ্ধ মায়ের একার আয়ে আর সংসার চলে না। মাধ্যমিকে জিপিএ-৪.৫ পাওয়া নাজিমের বোন সাদিয়ার পড়াশোনার ইতি ঘটে সেখানেই। মায়ের সঙ্গে কাজে লেগে যায় সুদিনের আশায়।

মা-মেয়ের আয়ে কোনোরকমে সংসার চলে। কিন্তু নাজিমের পড়াশোনার খরচ চলে না। বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রদের তালিকায় থাকা নাজিমেরও পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। প্রাথমিক শেষ করে সবে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া নাজিম এখনই নিয়তির কাছে হারতে রাজি নয়। সিদ্ধান্ত নেয় যেকোনো মূল্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার। বাড়ির পাশেই সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করে। বিকেল চারটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তার পড়াশোনার খরচ জোটানোর এই লড়াই।

‘কাজ করে পড়াশোনার সময় পাও?’ মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর দেয় নাজিম। ভোরে ওঠে আরবি পড়ি, তারপর কোচিং। কোচিং শেষে স্কুল। তারপর দোকান খুলি। দোকান খুলে খেলতে যাই। এর মধ্যেই সময় করে পড়া শেষ করি।’ নাজিমের খেলতে যাওয়ার কথায় জানতে চাই, দোকান খোলা রেখে খেলতে যায় কীভাবে?

নাজিমের পেছনে বসে থাকা তার দোকানের মালিক শাহাদাত হোসেন তখন এগিয়ে আসেন। নাজিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। ‘আমিই খেলতে পাঠাই। বাচ্চা ছেলে, খেলার সময়টাতে দোকানে কাজ করলে ওর মন খারাপ থাকবে, পড়াশোনায় মন বসবে না। এ কারণেই চাই ও হাসুক, খেলুক। ওর বাবা নাই, টাকা নাই, তবু পড়াশোনা করে। এটা আমি পছন্দ করি। আমি চাই ওর স্বপ্নগুলো পূরণ হোক।’

নাজিমের স্বপ্নের কথা জানতে চাই। কিছুক্ষণ থেমে নাজিম উত্তর দেয়। ‘আব্বা মারা যাওয়ার আগে আমিই হাসপাতালে ছিলাম। তখন আব্বা কোনো কথা বলে নাই, আমার দিকে তাকাইয়া থাকত। একদিন আব্বারে বলছি আপনি চিন্তা কইরেন না, আম্মা আর বোনদের দেইখা রাখমু।’ নাজিম জানায়, মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতন তার। দুই হাজার টাকা পড়াশোনার খরচ। বাকি টাকা মায়ের কাছে সঞ্চয় করে। নাজিমের স্বপ্ন, বোনের বিয়ে দিবে। তারপর জমানো টাকায় গ্রামে মায়ের জন্য একটা দোতলা ঘর করে দেবে। সে ঘরে পাঁচটা কক্ষ হবে। বোনেরা সবাই এসে একসঙ্গে থাকবে সেই ঘরে।

প্রশ্ন করি পড়াশোনা করে কী করতে চায় সে? দ্বিধাহীন স্বরে নাজিম উত্তর দেয়, ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার হমু।’ ইঞ্জিনিয়ারই কেন, অন্য কিছুওতো হতে পারো?—প্রশ্ন করলে নাজিম যুক্তি দাঁড় করায়। বলে, ‘আমি ইলেকট্রিক্যালের অনেক কাজ করতে পারি। ফ্যান, চার্জার লাইট বানাইতে পারি। তারপর অনেক কিছু ঠিকও করতে পারি।’ পরক্ষণেই অদ্ভুত আরেক স্বপ্নের কথা বলে নাজিম। ‘ইঞ্জিনিয়ার হইয়া আমি একটা বড় মুদিদোকান দিমু।’ কেন?—জিজ্ঞাসা করতেই নাজিমের গলা জড়িয়ে আসে। বলে, ‘আব্বা রাইতে দারোয়ান আর দিনে একটা মুদিদোকানে চাকরি করত। ইচ্ছা আছিল কোনো দিন টেকা হইলে একটা মুদিদোকান দিয়া দারোয়ানির চাকরিটা ছাইড়া দিব। সারা রাইত বাইরে বইসা থাকতে নাকি আব্বার অনেক কষ্ট হইত।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন