default-image

চাঁদপুরের মতলব সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ফারহানা আক্তার। উপজেলা শহরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। গ্রামে ইন্টারনেট–সুবিধা নেই বললেই চলে। ফারহানার কাছে নেই স্মার্টফোনও।

ফারহানা আক্তার বলেন, ‘কলেজের ক্লাস মার্চ মাস থেকে বন্ধ। অনলাইনের ক্লাসগুলোও পাচ্ছি না। এভাবে চললে ভবিষ্যতে পরীক্ষার খাতায় কী লিখব? পাস করব কীভাবে? লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’

স্মার্টফোন ও শক্তিশালী ইন্টারনেট–সুবিধা না থাকায় ফারহানার মতো মতলব দক্ষিণ উপজেলার ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ তথ্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ের। তারা বলছে, উপজেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫৫টি। এর মধ্যে উচ্চবিদ্যালয় ৩১টি, মাদ্রাসা ১৮টি এবং কলেজ রয়েছে ৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এর মধ্যে শিক্ষকদের অনলাইনভিত্তিক ক্লাসে যুক্ত থাকছেন মাত্র সাড়ে ৮ হাজারের মতো শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, বাকি ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীই এ সুবিধা পাচ্ছেন না। গত জুনের শেষ দিকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিজ্ঞাপন
আমাদের এলাকায় ইন্টারনেটের নেটওয়ার্ক নেই। আমার কাছে স্মার্টফোনও নাই। এলিগা স্যারেরা অনলাইনে কোন সময় কোন ক্লাস নেন জানতে পারি না। বাড়িতে লেখাপড়ায়ও অইতাছে না। করোনায় আমাগো লেহাপড়ার ১২টা বাজায় দিছে।
মো. নাঈম, কলেজছাত্র, উপাদী, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর

উপজেলার উপাদী গ্রামের কলেজছাত্র মো. নাঈম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ইন্টারনেটের নেটওয়ার্ক নেই। আমার কাছে স্মার্টফোনও নাই। এলিগা স্যারেরা অনলাইনে কোন সময় কোন ক্লাস নেন জানতে পারি না। বাড়িতে লেখাপড়ায়ও অইতাছে না। অ্যামনে চললে সামনে পরীক্ষায় পাস করুম ক্যামনে। করোনায় আমাগো লেহাপড়ার ১২টা বাজায় দিছে।’

উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার মাধ্যমিক পর্যায়ের দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে স্কুল-কলেজ বন্ধ। বাড়িতে ছেলেমেয়েরা তেমন লেখাপড়া করছে না। তাঁরা জানতে পেরেছেন, শিক্ষকেরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের সন্তানদের কাছে মুঠোফোন নেই, নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। করোনার এই সংকটের সময়ে পরিবারের খরচ সামলাতেই হিমশিম। এর মধ্যে সন্তানদের পড়াশোনার জন্য দামি মুঠোফোন বা ইন্টারনেট কেনার টাকা তাঁদের জোগাড় করা অসম্ভব এক ব্যাপার। সরকারে উচিত, শিক্ষার্থীদের ক্লাসের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করা।

বিজ্ঞাপন
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রুটিন মেনে তাঁরা নিয়মিত অনলাইনে কলেজের ফেসবুক আইডির মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু নানা কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ওই ক্লাসে যুক্ত থাকতে পারছেন না বা থাকছেন না।

মতলব সরকারি কলেজের তিনজন এবং মতলব জে বি সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রুটিন মেনে তাঁরা নিয়মিত অনলাইনে কলেজের ফেসবুক আইডির মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু নানা কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ওই ক্লাসে যুক্ত থাকতে পারছেন না বা থাকছেন না। এটি দুঃখজনক। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এসব শিক্ষার্থীর সহায়তায় সবারই এগিয়ে আসা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

মতলব সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক রবিউল আলম বলেন, গত জুন থেকে তিনি একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন। তাঁর বিষয়ে (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪৭। গড়ে প্রায় ৫৯ জন প্রতিটি ক্লাসে যুক্ত থাকছেন। বাকি ৮৮ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে যুক্ত থাকছেন না।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আ. রহিম খান বলেন, মতলব দক্ষিণ উপজেলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকেরা অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। সব শিক্ষার্থীর উচিত এসব ক্লাসে যুক্ত থাকা। যাঁরা যুক্ত হতে পারছেন না, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সব প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য পড়ুন 0