default-image

ইরাকে অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিককে জিম্মি করে দেশে টাকা আদায়ের অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে মাগুরার পুলিশ। দেশে পুলিশের তৎপরতায় জিম্মিকারীদের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছেন মাগুরার রাজু ফকির (৩১) নামের এক ব্যক্তি। ছাড়া পাওয়া রাজু ফকির বাংলাদেশের পুলিশকে জানিয়েছেন, ওই চক্র এখনো অন্তত ৯ বাংলাদেশিকে জিম্মি করে রেখেছে। আর জিম্মিকারী চক্রটির হোতাও বাংলাদেশি। তাঁর নাম শাহনাজ গাজী, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চেচুরী গ্রামে তাঁর বাড়ি।

পুলিশের একাধিক সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, ইরাকে জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া রাজু ফকির বর্তমানে বাগদাদে রয়েছেন। দুই বছর আগে ইরাকে যান তিনি। তিনি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের বনগ্রামের মতিয়ার ফকিরের ছেলে।

রাজু ফকিরের স্ত্রী সুমি বেগম প্রথম আলোকে বলেন, গত ১৭ মার্চ তাঁর স্বামীর মুঠোফোন (ইমো) থেকে কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে রাজু ফকির জানান, তাঁকে অপহরণকারীরা জিম্মি করেছে। ব্যাপক মারধর করা হচ্ছে। মুক্তিপণ হিসেবে চার লাখ টাকা দাবি করেছে চক্রটি। আর এই টাকা পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের কয়েকটি মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজুর ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, সে খবরও পরিবারকে পাঠাতে থাকে জিম্মিকারীরা। পরিবারের উপার্জনকারী লোকটিকে বাঁচাতে জিম্মিকারীদের পাঠানো একটি মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে ৫০ হাজার টাকা পাঠান রাজুর স্বজনেরা। টাকা পাঠানোর পরও জিম্মিকারীদের কথায় সন্দেহ হয় পরিবারের। শেষে উপায় খুঁজে না পেয়ে গত ২২ মার্চ মহম্মদপুর থানায় মানব পাচার ও প্রতিরোধ দমন আইনে একটি মামলা করেন রাজুর বাবা মতিয়ার ফকির।

বিজ্ঞাপন
মাগুরার এক প্রবাসীকে ইরাকে জিম্মি করে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। পুলিশ দেশে চারজনকে গ্রেপ্তারের পর ওই প্রবাসীকে ছেড়ে দেয় চক্রটি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহম্মদপুরের রাজাপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ৫০ হাজার টাকা পাঠানো একটি ‘বিকাশ নম্বর’ ধরে তদন্তে নামে পুলিশ। ওই সূত্র ধরে গত ২২ মার্চ যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দুজন হলেন খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চেচুরী গ্রামের রুস্তম গাজীর ছেলে মো. জিহাদ হাসান (৩১) ও একই উপজেলার কাটিংগা গ্রামের কলিম উদ্দিনের ছেলে ওবায়দুল ইসলাম (২২)।

পুলিশ বলছে, জিহাদ হাসানকে গ্রেপ্তারের পর চাপে পড়ে গত ২৪ মার্চ রাজু ফকিরকে ছেড়ে দেয় জিম্মিকারীরা। জিহাদ হাসান অপহরণকারী চক্রটির নেতা শাহনাজ গাজীর চাচা। গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পারে, চেচুরী গ্রামের শাহনাজ গাজীর চক্রটিই রাজু ফকিরকে ইরাকে জিম্মি করেছে। শাহনাজ গাজী প্রায় ১৫ বছর ধরে ইরাকে অবস্থান করছেন। জিহাদ ও ওবায়দুলের কথায় পুলিশের ধারণা হয় যে শাহনাজ গাজীই ইরাকে অপহরণকারী চক্রটির মূল হোতা। গ্রেপ্তার দুজনের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ২৬ মার্চ মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা বাজারের মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট ফকরুল হাসান ও একই উপজেলার নিত্যানন্দপুর গ্রামের আকবর সর্দার নামের আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে আকবর সর্দারের ছেলে ইরাকে শাহনাজ গাজীর সঙ্গে থাকেন।

এসআই জামাল উদ্দিন বলেন, গ্রেপ্তার চারজনই অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা এখন কারাগারে। আর জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পাওয়া রাজু ফকির ইরাকের বাগদাদে তাঁর চাচার আশ্রয়ে রয়েছেন।

রাজু ফকিরের স্ত্রী সুমি বেগম বলেন, অপহরণকারীদের নির্যাতনে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন রাজু। তিনি ছাড়া পেলেও এখনো নিজের পাসপোর্ট ও ছিনিয়ে নেওয়া ৬০০ ডলার ফেরত পাননি। একই সঙ্গে তাঁরা বিকাশে যে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন, তা-ও ফেরত পাননি।

এই মামলার তত্ত্বাবধান করেছেন মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মোহাম্মদ ইব্রাহীম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আমরা যখন রাজু ফকিরকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি, তাঁর কাছে জানতে পেরেছি সেখানে আরও অন্তত ৯ বাংলাদেশি একইভাবে জিম্মি অবস্থায় আছেন। তবে তাঁদের কারও পরিচয় জানা যায়নি।’ মোহাম্মদ ইব্রাহীম আরও বলেন, শাহনাজ গাজী নামের ওই ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের বেশি বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলে জিম্মি করেন। এমনিভাবে আটক ব্যক্তিকে দিয়ে বা শাহনাজ গাজী নিজে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা আদায় করেন।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন