default-image

পদ্মায় ইলিশ শিকারের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে। টানা দুই মাস নিষেধাজ্ঞা শেষে শুক্রবার মধ্যরাতের পর থেকে পটুয়াখালীর দশমিনার জেলেরা তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ শিকারে নেমে হতাশ হচ্ছেন।

নিষেধাজ্ঞা শেষে যেখানে জালভর্তি ইলিশ মাছ পেয়ে জেলেদের মুখে হাসির ঝিলিক লেগে থাকার কথা, সেখানে অধিকাংশ জেলের মুখ ছিল মলিন। কারণ, নদীতে ইলিশ শিকারের আয়োজনে তাঁদের খরচের টাকাই উঠছে না।

এদিকে ইলিশের মৌসুমের শুরুতেই নৌকা ও জাল কেনা এবং মেরামতের জন্য মহাজনের কাছ থেকে দাদনসহ স্থানীয় পর্যায়ে ঋণ করেন জেলেরা। মৌসুম এলে চার-পাঁচ মাস ইলিশ শিকার করেন। সেই মাছ বিক্রির আয় দিয়ে দাদন ও কিস্তির মাধ্যমে ঋণ শোধ দেন তাঁরা। বাকি টাকায় সংসার চলে। কিন্তু আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন, এই চিন্তায় দিন কাটছে জেলেদের।

রোববার সকালে তেঁতুলিয়া নদীর পার দশমিনার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া গ্রামের জেলেপল্লি ও স্লুইসগেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর পাড়ে অনেক জেলের নৌকা নোঙর করা রয়েছে। কেউ মাছ ধরতে জাল নিয়ে নেমে পড়ছেন। আবার কেউ জাল ফেলে তেমন মাছ না পেয়ে নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে আছেন। এ সময় জেলেপল্লির ইউনিয়ন জেলে সমিতির সভাপতি শাহজাহান খান (৫২) বলেন, তাঁর চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিন ছেলে তাঁর সঙ্গে তেঁতুলিয়ায় ইলিশ ধরেন। তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার ইলিশের অভয়াশ্রম এলাকা। মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাস এখানে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে তিন ছেলে সোহাগ, আল-আমিন ও আবদুল্লাহ মিলে তেঁতুলিয়ায় ইলিশ শিকারে নামেন। কিন্তু তেমন ইলিশ মিলছে না। রোববার রাতভর তিনবার তেঁতুলিয়ায় জাল ফেলে ৩০০ গ্রাম থেকে ৭০০ গ্রাম সাইজের ৮টি ইলিশ এবং অল্প কিছু পোয়া মাছ পেয়ে ঘাটে এসে নোঙর করে বসে আছেন।
শাহজাহান বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় মহাজনের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা দাদন নিয়ে ট্রলার ও জাল মেরামত করেছেন তিনি। এ ছাড়া স্থানীয় এনজিওদের কাছ থেকেও ৪০ হাজার টাকা ঋণ তুলেছেন। এখন প্রয়োজনীয়সংখ্যক ইলিশ না পেলে কীভাবে কিস্তি পরিশোধ করবেন, আর কীভাবে দাদনের টাকা শোধ হবে তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।

বিজ্ঞাপন

তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ের আরেক জেলে ফোরকান খান (৪৫)। তিনিও তাঁর দুই ছেলে রুবেল ও সজীবকে নিয়ে তেঁতুলিয়ায় ইলিশ ধরে। ফোরকান বলেন, ‘দুই মাস বন্ধ থাকার পর নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাবে বলে তাঁর আশা ছিল। কিন্তু ইলিশ না পাওয়ায় দাদন ও কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুচিন্তায় পড়েছেন তিনি। তাঁর ইউনিয়নে ১ হাজার ৪০০ জন ইলিশ জেলে রয়েছেন। সবাই কমবেশি দাদন ও ধারদেনা করে ইলিশ শিকারে নামেন। তবে এবার নিষেধাজ্ঞা শেষে তেঁতুলিয়ায় জাল ফেলে হতাশ হচ্ছেন জেলেরা।’

এদিকে বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট এলাকার ইলিশ মাছের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও তেমন ইলিশ নেই। একজন আড়তদার বলেন, মৌসুমের আগেই তাঁরা ইলিশের আশায় জেলেদের লাখ লাখ টাকা দাদন দিয়েছেন। ইলিশ যা পাবে তার পুরোটাই আড়তে দেওয়ার শর্ত মেনে জেলেরা দাদন নিয়েছেন। আড়তে বর্তমানে জেলেদের কাছ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৬০০ টাকা কেজি দরে, ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৩৫০ টাকা ও ৩০০ গ্রামের ইলিশ ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে গ্রেড এক কেজি ওজনের ইলিশ ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা জেলেদের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে।

মিরাজ খাঁ নামের এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, ‘অন্যান্য বছর নিষেধাজ্ঞা শেষে অনেক ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ত। গত বছর অনেক মাছ বেচাকেনা করেছি। ভালো মাছ ধরা পড়বে এই আশায় অনেক জেলে ধার-দেনা করে জাল ও নৌকা নামাইছে। নদীতে মাছ না পড়ায় জেলেদের পাশাপাশি আড়তদারেরাও হতাশ। কারণ, ইলিশ না মিললে কীভাবে তাঁদের দাদনের টাকা উঠবে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার নদীতে মাছের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের ঋতুগুলোতেও আলাদা বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর প্রভাবে মৌসুমের আগপিছ হচ্ছে। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত ইলিশের তেমন দেখা মিলবে না। গত ছয় মাসের মধ্যে এক দিনও বৃষ্টি হয়নি। তবে ভারী বৃষ্টিপাত ও পানি বাড়তে শুরু করলে ইলিশের প্রাচুর্য বাড়বে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন