বিজ্ঞাপন

নদী থেকে ২০০ গজ দূরে দেবগ্রাম ইউপির উত্তর কাওয়ালজানি কোব্বাত মাতুব্বরপাড়ায় বাস করেন বিধবা চায়না বেগম (৬০)। তাঁর বাড়ি ছিল দেবগ্রামের বেথুরী গ্রামে। একসময় তাঁর বড় বাড়ি ছিল, জমিজমা ছিল। নিজের জমি দেখাশোনা করতেন স্বামী হাসমত খাঁ। কৃষিকাজ করেই তাঁদের চলত সংসার। শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বাসা বাঁধায় প্রায় ৩০ বছর আগে হাসমত খাঁ মারা যান। বিলকিস খাতুন ও আকিরুন নেছা নামের দুই কন্যাসন্তান নিয়ে চলে সংসার।

প্রায় ১৫ বছর আগে বড় মেয়ে বিলকিস খাতুন ও কিছুদিন পর ছোট মেয়ে আকিরুননেছার বিয়ে দেন। এরপর নদীভাঙনে অধিকাংশ জমি বিলীন হওয়ায় পড়েন সংকটে। ছোট মেয়েজামাই মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে সংসারে অশান্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তাঁর ছোট মেয়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়।

তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে নিয়ে চলে চায়না বেগমের সংগ্রাম। ১০ বছর আগে নদীভাঙনে বসতভিটা সব নদীতে বিলীন হয়ে যায়। সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারটি আশ্রয় নেয় দেবগ্রামের উত্তর কাওয়ালজানি গ্রামে। স্থানীয় ছাত্তার শেখের কাছ থেকে ৬ শতক জমি বার্ষিক ১৬০০ টাকায় ভাড়া নিয়ে সেখানে বাস করছেন। এই বৃদ্ধ বয়সে তেমন কাজ করতে না পারেন না। সংসার চালানোর খরচ জোগানো, অন্যদিকে জমির ভাড়া দিতে গিয়ে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন।

আজ শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে বাড়িতে দেখা যায়, চায়না বেগম রান্না করার মাটির উঁচু ঢিবির উঠোনে বসে আছেন। ভাঙা খুপরির উঠানে বসে আছেন মেয়ে। চুলার ওপর রয়েছে একটি খালি পাতিল, পাশে বাঁশের ঝুড়ি।

ঈদে কী করছেন, জানতে চাইলে চায়না বেগম বলেন, ‘কী করব বাবা। সবকিছুই তো শেষ। আমাগোর আবার ঈদ আছে? কী রান্না করমু, তা-ই চুলার পাড়ে বইসা ভাবতাছি। গ্রাম সম্পর্কে এক ভাই এক প্যাকেট সেমাই দিছে, তা-ই রান্না করমু। অথচ একসময় ঈদের দিন বাড়িভর্তি মানুষের জন্য খিচুড়ি, সেমাই কত কি রান্না হতো।’

পাশের দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ব্যাপারীপাড়া গ্রামে স্থানীয় উসমান সরদারের জায়গায় বাস করেন বিধবা নাছিমা বেগম (২৫)। স্বামী জব্বার সরদার ৪ বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর এক ছেলে ও তিন মেয়ে। বাহির বেথুরী গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসতঘর, জমি সবই ছিল। কিন্তু সর্বনাশা পদ্মার ভাঙনে প্রায় ৮ বছর আগে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে এখানে (ব্যাপারীপাড়া) আশ্রয় নেন।
নাছিমা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট কয়েকটি টিনের ছাপড়া। দরজা বন্ধ, বাড়িতে কেউ নেই। প্রতিবেশীরা জানান, নাছিমা কাজে গেছেন। ছেলেমেয়েরা পাশের মুন্সী বাজারে দাদা-দাদি যেখানে থাকেন, সেখানে গেছে। নাছিমা বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত স্থানীয় যুবক মুন্নুর মুরগির খামারে শ্রমিকের কাজ করেন।
মুন্নুর মুরগির খামারে গিয়ে দেখা যায়, নাছিমা মুরগির খাবার জোগান দিতে ব্যস্ত। আলাপকালে তিনি বলেন,‘আজ ঈদের দিন। কিন্তু কী করব? কাজ না করলে তো বেতন পাব না। এক বছর ধরে ৪ হাজার টাকা বেতনে এখানে কাজ করি।  বড় ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে, দ্বিতীয় মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ও সবার ছোট মেয়ে শিশু শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। খামারে চাকরি করে যা বেতন পাই, তা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসার চালাতে হয়। এই স্বল্প আয়ে ঈদের কেনাকাটা কিছুই করতে পারিনি। এমনকি ঈদের দিন তিন ছেলেমেয়েকে ভালো কিছু রান্না করেও খাওয়াতে পারিনি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন