বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফেসবুক লাইভে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই তিনি অনেক হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে যেসব পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়েছিলেন, তা আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা প্রশাসনের সহায়তায় ছিঁড়ে ফেলেছেন। থানায় অভিযোগ করলে তারা দেখিয়ে দেয় ইউএনওকে, ইউএনওর কাছে গেলে বলে উপজেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে যেতে। আর তাঁকে বললে তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ে নির্বাচন কর্মকর্তাকে বলেন। এভাবে তাঁরা হয়রানি করেছেন। কিন্তু কেউ সহযোগিতা করেননি।

জান্নাতুল ফেরদৌস আরও বলেন, তাঁর প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়েছে। মাইক ভেঙে ফেলা হয়েছে। সমর্থকদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সপরিবারে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তানোর-গোদাগাড়ীর দলের প্রধান তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার এবং পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাকে ভোট করতে দিব না। পাস করতে দিব না, মাঠে নামতে দিব না।’ তাঁর কথা না শোনাতে তিনি উঠেপড়ে লেগেছেন। জান্নাতুলের প্রতিটা পদক্ষেপে বাধা দিয়েছেন। সমর্থকদের প্রত্যেকের বাসায় বাসায় তল্লাশি করে কর্মীদের উঠিয়ে নিয়ে গেছেন।

ভোটের দিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করে এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, আজকে তিনি ১৬টি কেন্দ্রে এজেন্ট দিয়েছেন। কিন্তু কোনোটিতেই তাঁর কোনো এজেন্টকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ১ নম্বর ওয়ার্ডের কেন্দ্রে তিনি গিয়েছিলেন। শাহীন, জামরুল ও কমিশনার জাব্বারের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, এঁদের বাহিনী নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করেছেন এবং তাঁকে কেন্দ্র থেকে ঠেলে বের করে দেওয়া হয়েছে। সেই কেন্দ্রে তিনি এজেন্ট দেননি। অথচ তাঁরা নিজেদের মতো করে জান্নাতুলের একজন এজেন্ট পরিকল্পিতভাবে দিয়ে রেখেছেন। তাঁরা এভাবে একতরফাভাবে নৌকার ভোট করছেন। কেন্দ্রে কেউ ভোট দিতে গেলে জোরপূর্বক নৌকাতে চাপ দেওয়াচ্ছেন। প্রতিটি কেন্দ্রে এভাবে আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থকেরা পাহারা দিয়ে ভোট নিচ্ছেন। এসব কারণে তিনি ভোট বর্জন করেছেন। এই ভোট তিনি মানেন না।

বিএনপি প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, সকালের দিকে পরিস্থিতি দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই ভোট তিনি করবেন না। কোনো কেন্দ্রে তাঁর এজেন্ট নেই। আওয়ামী লীগ থেকে তাঁর প্রতীক মোবাইল ফোনের এজেন্ট বানিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এ কারণে তিনি তাঁর সব সমর্থকদের ভোট বর্জন করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং নিজেও এই ভোট বর্জন করেছেন। তিনি দাবি করেন, যতগুলো ভোট পড়েছে সকাল থেকে, তা জোর করেই নিয়েছে। তাই এই ভোট তিনি মানেন না। তিনি পুনরায় নির্বাচন চান।

নৌকাপ্রার্থী অয়েজ উদ্দিন বিশ্বাস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী তো দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তাঁর দলীয় সমর্থকেরাই তাঁর পোস্টার ছিঁড়েছেন। আর জান্নাতুল ফেরদৌসের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁর স্বামীর ভোট ছিল এলাকায়। এই এলাকায় ‘মহিলা মানুষ’কে কেউ ভোট দেয় না। খামাখা নির্বাচন করছেন। তাঁর সব অভিযোগ মিথ্যা। তাঁরা কাউকেই বাধা দিচ্ছেন না।

আঙুল চেপে ধরে নৌকায় ভোট

পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুঠিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার প্রায় ৩ হাজার ৩০০ জন। আজ দুপুর পর্যন্ত ১৫ শতাংশও ভোট পড়েনি। এ সময় ৬০ বছর বয়সী এক নারীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা যায়। অল্প কিছুক্ষণ পর তিনি বের হয়েই আঙুল দেখালেন। আঙুলে কালির দাগ। তিনি বললেন, ‘ব্যাটা নৌকায় জোর করে ভোট দিয়া দিল এক ছেলে। আমি দিতে চাইনি।’ তিনি প্রথম আলোকে আরও বলেন, ‘এখন এই কথা যদি কাউকে বলি, এগুলো বলা যায়? ভোট দিতে পারলাম না ব্যাটা।’

ওই কেন্দ্রে গিয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রের একজন আনসার সদস্য বলেন, তিনি অনেক ভোটের অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এ রকম ভোট কখনো কোথাও দেখেননি।

সব কেন্দ্র ফাঁকা

গোদাগাড়ী পৌর নির্বাচনে সকাল থেকে কোথাও কোনো লাইন দেখা যায়নি। নৌকা প্রার্থীর সমর্থকেরা বলেকয়েও ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে পারছেন না। একজন ওয়ার্ড কমিশনার বলেন, এখানে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা নৌকাকে ভোট দেবেন না। কারণ, তাঁরা জান্নাতুল ফেরদৌসকে ভালোবাসেন। কিন্তু ভোট দিতে পারছেন না। ভোট সুষ্ঠু হলে ভোটকেন্দ্রে লাইন থাকত। প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটাররাও ভোট বর্জন করেছেন।

একটি কেন্দ্রে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নৌকার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি প্রথম আলোকে নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, তাঁরা তীর্থের কাকের মতো ভোটারের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু পাচ্ছেন না। অনেককে বাড়ি বাড়ি পাঠানো হচ্ছে। তবুও তাঁরা আসছেন না। মূলত সব প্রার্থীর বর্জনের কারণে এটা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

দুপুর পর্যন্ত ১৮ শতাংশ ভোট

পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩২ হাজার ৯০৫। ১৬টি কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত পাঁচ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, একটি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ। কেন্দ্রগুলোতে অলস সময় কাটাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অন্যরা। সবশেষ ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কেন্দ্রের একটি বুথে গিয়ে দেখা যায় ৪১৬ ভোটের মধ্যে কেবল ৩২টি ভোট পড়েছে। সেখানে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বলেন, এ রকম ভোট কখনো তাঁরা আগে দেখেননি।

মাদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আফজাল হোসেন এই প্রতিবেদককে দেখামাত্রই বলেন, অন্য কেন্দ্রের কী অবস্থা? সেখানে কেমন ভোট পড়ছে? তাঁর কেন্দ্রে ১৮ শতাংশের বেশি। পাশেই আরেক সাংবাদিক বলে উঠলেন, ‘আপনার কেন্দ্রই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে।’
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মশিহুর রহমান বলেন, বেলা ২টা পর্যন্ত ১৮ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। বিকেলের দিকে ভোটারের উপস্থিতি বাড়বে কি না, তা তিনিও বলতে পারছেন না।

প্রার্থীদের ভোট বর্জন ও অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, একজন প্রার্থী ফেসবুক লাইভে এসে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বলে শুনেছেন। এ বিষয়ে লিখিত কোনো কিছু তিনি পাননি। গতকাল একজন বর্জন করেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা জেনেছেন। মোবাইল ফোন প্রতীকের প্রার্থী গোলাম কিবরিয়ার বর্জনের বিষয়েও তিনি অফিসিয়ালি কিছু জানেন না। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে কাউকে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসন সবাইকে সহযোগিতা করছে। কারও বিরুদ্ধে নন তাঁরা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে মেয়র নির্বাচিত হন মনিরুল ইসলাম। এরপর এপ্রিলে ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে তিনি মারা যান। সে কারণেই এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন