বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একইভাবে জেলায় সেদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন, কেনা হয়েছে ১১ হাজার ৬৭১ মেট্রিক টন। আতপ চালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৯৭৭ মেট্রিক টন, কেনা হয়েছে ৯ হাজার ৯৭৫ মেট্রিক টন। গত বছর সুনামগঞ্জে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার ৬৬৪ মেট্রিক টন, কেনা হয়েছিল ১৭ হাজার ১২১ মেট্রিক টন। এর আগের বছর ২০১৯ সালে কেনা হয়েছিল ১৭ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জে সরকারিভাবে কোনো ধান কেনা হয়নি। ২০২০ সালের আগে একজন কৃষকের কাছ থেকে এক মেট্রিক টন করে কেনা হয়েছে। এরপর কৃষকদের উৎসাহ দিতে একজন কৃষককে তিন মেট্রিক টন করে ধান বিক্রি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

সুনামগঞ্জে এবার সরকারিভাবে অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৯ হাজার ৬৫৯ মেট্রিক টন। নির্ধারিত সময় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত জেলার ১১টি উপজেলায় কেনা হয়েছে ১৭ হাজার ৪১ মেট্রিক টন।

সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নকীব সাদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষকেরা যেন ধানের ভালো দাম পান। এবার সরকার ধানের দর নির্ধারণ করার পর মাঠে দাম বেড়েছে, এতে কৃষকেরা লাভবান হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সুনামগঞ্জে গুদামে ধান দিতে কৃষকদের নানাভাবে উৎসাহিত করেছি। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা চেষ্টা করেছেন। এখনো কৃষকদের ঘরে ঘরে ধান পাবেন, তাঁরা আরও লাভের আশায় আছেন। মূলত বাজারদর ভালো থাকার কারণেই কৃষকেরা গুদামে ধান কম দিয়েছেন। এর পাশাপাশি হাওরের দুর্গম যাতায়াত এবং করোনা পরিস্থিতির কারণেও সংগ্রহে কিছুটা সমস্যা হয়েছে।’ এরপরও দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় সুনামগঞ্জে ধানের সংগ্রহ ভালো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জানা গেছে, সুনামগঞ্জের বাজারে এখন জাতভেদে ধান প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১৪০ টাকা দরে। জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, এবার শুরুতে মাঠে ধানের দাম কিছুটা কম থাকলে এখন বেড়েছে। যে কারণে গুদামে ধান দিতে আগ্রহ কম কৃষকদের। পাশাপাশি ধান গুদামে নিয়ে যেতে পরিবহন ও শ্রমিকের ব্যয় আছে। যাতায়াতের সমস্যা, গুদামে যাওয়ার পর হয়রানির সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাতের কারণেও অনেকে গুদামে ধান নিয়ে যেতে আগ্রহ দেখান না।

default-image

খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশাখের শেষ কিংবা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুর দিকে মাঠে ধানের দাম কম থাকে। তখন গুদামে বেশি টাকায় বিক্রি করা যায়। কিন্তু তখন কৃষকেরা ধান নিয়ে গুদামে যেতে পারেন না। ধান কাটা-মাড়াই নিয়ে মাঠে ব্যস্ত থাকতে হয় তাঁদের। একই সঙ্গে হাওরে তখন পানি না থাকায় ধান পরিবহনে সমস্যা হয়। এরপর যখন হাওরে পানি আসে, যাতায়াতের সুবিধা হয়, তখন দেখা যায় মাঠে ধানের দাম বেড়ে গেছে। তাই কৃষকেরা সরকারি গুদামের চেয়ে বাইরে বিক্রি করেই লাভবান হন বেশি।

কৃষক ও কৃষকদের পক্ষে থাকা সংগঠনের নেতারা বলছেন, সরকার নানাভাবে প্রকৃত কৃষকদের কাছে থেকে ধান ক্রয়ের চেষ্টা করলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। এখানে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির লোকের একটা সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। তারাই সব নিয়ন্ত্রণ করে। তাই গুদামে গেলে কৃষকেরা নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হন। ধানের আর্দ্রতা, ওজনের ঠিক নেই, আজ নয় কাল—এসব বলে নানাভাবে তাঁদের হয়রানি করা হয়। এসব কারণে গুদামে ধান দিতে উৎসাহ হারান তাঁরা।

সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, গুদামে গিয়ে তো কৃষকেরা লাইন পান না। এক বা দুই টন ধান কষ্ট করে নেওয়ার পর যদি বলে ধান আরও শুকাতে হবে, দুই দিন পরে নিয়ে আসেন, তাহলে কৃষক সেগুলো নিয়ে যাবেন কোথায়। শুধু এটা নয়, আরও নানা ভোগান্তি আছে। গুদামে অকৃষকদেরই দাপট থাকে বেশি। তাই কৃষকেরা সেখানে যেতে চান না।

সুনামগঞ্জে হাওরের কৃষি ও কৃষকরক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘প্রকৃত কৃষকদের যদি উপকার করতে হয় এবং তাঁদের কাছ ধান কিনতে হলে একটা সময়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে অস্থায়ী ক্রয়কেন্দ্র চালু করতে হবে। বাড়ির পাশে ধান বিক্রি করতে পারলে কৃষকেরা উৎসাহী হবেন এবং উপকার পাবেন। এই দাবিটি আমরা সব সময় করি, কিন্তু সরকার তো সেটি করে না।’

সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় ধানের বাজার জেলার মধ্যনগর উপজেলায়। মধ্যনগর বাজার ধানচাল আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. জহিরুল হক বলেন, নিজেদের প্রয়োজনে কৃষকেরা বৈশাখ মাসেই কম দামে ধান বিক্রি করেন বেশি। তখন তাঁরা থাকেন নানা সমস্যায়। বাধ্য হয়েই ধান বিক্রি করতে হয়। কিন্তু তখন সরকারের ধান কেনা শুরু হয় না। এখন বাজারে ধানের যে দাম আছে, তাতে কৃষকেরা গুদামে না দিয়ে বাইরে বিক্রি করলে লাভ পাচ্ছেন বেশি। যে কারণে গুদামে ধান দিতে তাঁদের আগ্রহ কম।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন