বিজ্ঞাপন

কামরুজ্জামানের বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের চৌরাকররা গ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে চাকরি করছেন বাংলাদেশ পুলিশে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে। কর্মরত আছেন পুলিশ সদর দপ্তরে।

কামরুজ্জামান জানান, ছোটবেলায় বই না পেয়ে তাঁর মন খারাপ হতো। সেই থেকে ইচ্ছা ছিল গ্রামে একটি পাঠাগার করার। ২০১০ সালে ইচ্ছা পূরণ হয় তাঁর। তখন তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ তত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেণির ছাত্র। নিজে কিছু বই কেনেন, আর বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে কিছু বই সংগ্রহ করেন। প্রায় ১০০ বই নিয়ে নিজেদের বাড়ির একটি কক্ষে চালু করেন পাঠাগার।

‘বই পড়ি, নিজেকে আলোকিত করি’ স্লোগান নিয়ে পাঠাগারটি শুরু হওয়ার পর থেকেই গ্রামের ছেলেমেয়ে, এমনকি বয়স্করাও সদস্য হতে শুরু করেন। ২০১৫ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষে কামরুজ্জামান গ্রামে ফিরে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। পাশাপাশি পাঠাগারটি আরও কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়, সে চেষ্টা চালান। বন্ধুবান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, ছোট ভাইদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করেন। বর্তমানে এ পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা আট শতাধিক। সদস্য ১০১ জন। টিনের চৌচালা ঘরে কামরুজ্জামানের পাঠাগার। ভেতরে গুটিকয় সেলফে সাজানো রয়েছে নানা বই। গল্প, উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ছাড়াও রয়েছে চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার বইপত্র।

পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালনা করে গ্রামেরই কলেজপড়ুয়া চার ছাত্র। তাদের একজন মো. বদিউজ্জামান। সে টাঙ্গাইল শহরের বিবেকানন্দ স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। সে জানায়, এই পাঠাগারে এখন সদস্যসংখ্যা ১০১। জনপ্রতি বার্ষিক চাঁদা ৫০ টাকা। বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। এ সময়ের মধ্যে বই দেওয়া–নেওয়া চলে। একটি বই ১৫ দিনের জন্য দেওয়া হয়। কারও পাঠাগারে আসতে অসুবিধা হলে ফোন করলেও বই পৌঁছে দেওয়া হয়।

পাঠাগারে কথা হয় মগড়া উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী মাসুমা আক্তারের সঙ্গে। তার ভাষ্য, এই পাঠাগার হওয়ায় তাদের বই পড়ার খুব সুবিধা হয়েছে। চাইলেই বই নিয়ে আসতে পারে। গ্রামের মধ্যবয়সী ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন জানান, অবসর সময়ে তাঁর বই পড়ার অভ্যাস। তাই এই পাঠাগারের সদস্য হয়েছেন। এখান থেকে বই নিয়ে নিয়মিত পড়েন।

ওই গ্রামের অধিবাসী চৌধুরী মালঞ্চ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার গ্রামের তরুণ সমাজের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে পারছে।

পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কামরুজ্জামানের বাবা মো. শাহজাহান জানান, প্রথমে যখন কামরুজ্জামান পাঠাগারটি স্থাপন করে, তখন মনে হতো পাগলামি করছে। কিন্তু কিছুদিন যেতেই দেখতে পেলেন, এটি খুব ভালো উদ্যোগ। তাই তিনি বাড়ির ঘরটি ব্যবহার করতে দিচ্ছেন।

কামরুজ্জামান জানান, তিনি না থাকলেও পাঠাগারটি যাতে টিকে থাকে, সে জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। পাঠাগার পরিচালনার জন্য গ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমন্বয়ে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করে দিয়েছেন। তাঁদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে এই পাঠাগার। পাঠাগারের জন্য গ্রামে একটি স্থায়ী জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তারপর সেখানে নিজস্ব ভবন করার স্বপ্ন দেখছেন কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সবার সহযোগিতায় পাঠাগারটি একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব ভবন এবং দেশ–বিদেশের বইপত্রে সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার নিশ্চয় আমরা গড়ে তুলতে পারব।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন