বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আছিয়া বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। তাঁদের ৯ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ভাইটির জন্মের এক ঘণ্টা পর মা মারা যান। মৃত্যুর কারণ বুঝতে পারছিলেন না। শুধু মনে আছে আঁতুড়ঘরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। এ মৃত্যু তাঁর মনে স্থায়ী ক্ষত হয়েই ছিল। এ ক্ষতটাতে প্রলেপ দিতে গিয়েই বোঝেন, মায়ের মৃত্যু ছিল প্রসব–পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। মায়ের মৃত্যুর এ ক্ষত মন থেকে মুছতে পারেননি। স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কাজের ফাঁকে স্বাভাবিক নিরাপদ প্রসব করানো শুরু করেন তিনি। এর জন্য কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। মায়ের মৃত্যুর ছবি ছিল মনে। চাইতেন ভুল ব্যবস্থাপনায় কোনো মায়েরই যেন মৃত্যু না হয়। কাজ করতে করতেই নিরাপদ প্রসবে দক্ষ হয়ে উঠলেন। আশপাশে নামডাক ছড়াল। আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ২০১১ সাল থেকে সাধুহাটি কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাভাবিক নিরাপদ প্রসবের কার্যক্রম শুরু হয়। সে বছরই ১৩৫ জন অন্তঃসত্ত্বার নিরাপদ প্রসব করান তিনি। দেশের কোনো কমিউনিটি ক্লিনিকে এত বেশিসংখ্যক নিরাপদ প্রসবের জন্য পুরস্কার পেলেন। ২০১২ সালের ২৮ মে সেরা স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

২০১৪ সালে স্বাভাবিক প্রসবের ওপর ছয় মাসের সিএসবিএর (কমিউনিটি স্কিল বার্থ অ্যাটেনডেন্ট) প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ তাঁকে আরও সাহসী করে। তাঁর কাজ আর নির্দিষ্ট স্থানে থাকেনি। নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে নানা জায়গা থেকে মায়েরা আসতে থাকেন। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ও খলিলপুর ইউনিয়ন ছাড়াও পাশের হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রচুর মা আসতে থাকেন কমিউনিটি ক্লিনিকটিতে।

আছিয়া বেগম বলেন, ‘অনেকের বাবার বাড়ি, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি আমাদের এলাকায়। আমার নাম শুনে সন্তান জন্মের আগে ডেলিভারির সুবিধা নিতে তাঁরা এখানে চলে আসেন। অনেকে আছেন যাঁর সব কটি বাচ্চারই প্রসব হয়েছে আমার হাতে।’

এ ক্ষেত্রে সময়-অসময় বলতে কিছু নেই। অনেকের কাছে তাঁর মুঠোফোন নম্বর আছে। রাত দুইটা-তিনটায় ফোন দিলেও ক্লিনিকে চলে আসেন তিনি। বেশির ভাগ প্রসবই হয় রাতে। কমিউনিটি ক্লিনিকে যেটুকু সুবিধা আছে, তাই দিয়ে প্রসবের ব্যবস্থা করেন। আগে বিদ্যুৎ ছিল না। মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ করেছেন। এখন নিরাপদ প্রসবের জন্য নতুন একটি ভবন হয়েছে। বিদ্যুতের সংযোগ ও পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় এ কমিউনিটি ক্লিনিকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক হাজারতম শিশুটির জন্ম হয় তাঁর হাতে।

এক হাজারের মাইলফলক স্পর্শ করা সেই মা হচ্ছেন ফারজানা বেগম। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ফরাশতপুরে। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত এ সংখ্যা পৌঁছেছে ১ হাজার ১৬ জনে।

আছিয়া খাতুন বলেন, ‘অনেক আগেই এক হাজার হতো। কিন্তু সরকারের অর্পিত দায়িত্ব পালন শেষে প্রসবের কাজটি করতে হয়। বেশির ভাগ সময় রাতেই প্রসবের কাজটি করি।’ তিনি বলেন, ‘যখন–তখন রোগী আসায় বিরক্ত হই না। বরং স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের পর মানুষের আনন্দ দেখে খুশি হই। মানুষ এত ভালো আচরণ করে। অনেকে মিষ্টি, অনেকে ফল নিয়ে আসে। অনেকে ২০ টাকা হাতে ধরিয়ে বলে আপা কিছু খাবেন। মানুষের এই আবেগটুকু আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ইচ্ছা করে রাত–দিন মানুষের সেবা দিই। কারও কাছে আমার কোনো চাওয়া–পাওয়া নেই। বরং অনেক রোগী আছে, যাদের বাড়ি ফেরার রিকশা ভাড়াও আমাকে দিতে হয়।’

তাঁর বাবার বাড়ি, স্বামীর বাড়ি দুটোই সাধুহাটিতে। স্বামী মো. মোস্তফা আহমদ ২০০৪ সালে মারা গেছেন। একমাত্র মেয়ে বিএসসি নার্সিংয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে।

আছিয়া বেগম আরও বলেন, তাঁর এ কাজে বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সহযোগিতা করেন। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রতি আছিয়া বেগমের একটাই পরামর্শ, তাঁরা যেন সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রসব করান।

সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা চিকিৎসক আবেদা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আছিয়া বেগম যত্নসহকারে রুটিন কাজের পাশাপাশি নিরাপদ প্রসবের কাজটি করেন। মূলত নিজের ইচ্ছা থেকেই এক হাজারের মাইলফলকে পৌঁছেছেন। প্রসবের সময় মানুষ অসহায় থাকে। অনেক দূর থেকে হাসপাতালে আসতে হয়। এখানে বিনা মূল্যে সেবাটা পাচ্ছে। তাঁর এই কাজ প্রশংসনীয়। আমরাও উচ্ছ্বসিত। তাঁকে আমরা অফিশিয়ালি শুভেচ্ছা জানিয়েছি। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জাইকার অর্থায়নে একটি ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এতে অনেকে উদ্বুদ্ধ হবে। আমরা আরও কিছু কেন্দ্রে এ রকম নিরাপদ প্রসব কার্যক্রম শুরু করতে চাইছি। মানুষ উপকৃত হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন