মেঘনার ভাঙনের কবলে বাঁধ। সম্প্রতি ভোলা সদর উপজেলার তুলাতুলি এলাকায়
মেঘনার ভাঙনের কবলে বাঁধ। সম্প্রতি ভোলা সদর উপজেলার তুলাতুলি এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

আজ ভয়াল ১২ নভেম্বর। ৫০ বছর আগের এই দিনে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ভোলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। এ দিনে আজও তাঁদের স্বজনেরা কাঁদেন। তবে স্বাধীনতার এত বছর পরও উপকূলসহ ভোলার মানুষ এখনো অনেকটাই অনিরাপদ।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে স্মরণকালে ভোলার সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান। উপকূলের প্রায় ৪ লাখ বাড়িঘর, সাড়ে ৩ হাজার স্কুল, ৩০ হাজার নৌকা, ৫০ লাখ মেট্রিকটন ফসলসহ অগণিত গবাদিপশুর ক্ষতি হয়।

দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া গ্রামের আবদুল মালেক (৭৪) ওই ঘূর্ণিঝড়ে ৯১ জন স্বজন হারিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার আসে, সরকার যায়, হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন হয়। কিন্তু ভোলা রক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মিত হয় না।

বিজ্ঞাপন

ভোলার লোকজন জানান, ওই ঘূর্ণিঝড়ের পর মানুষের পাশে দাঁড়াতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভোলায় গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় গিয়ে তিনি উপকূল রক্ষায় ভোলার চারদিকে ২৭০ কিলোমিটার বাঁধ তৈরি করেন। এটি শেখের বেড়ি নামে পরিচিত। কিন্তু ওই বাঁধ গত ৪৮-৪৯ বছরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এরপর এটির মতো টেকসই বাঁধও আর করা হয়নি।

লোকজন বলছেন, শেখের বেড়ি সংস্কারের অভাবে গত ৪৮-৪৯ বছরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিচু, চিকন ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু জোয়ারের উচ্চতা বেড়েছে। এ কারণে ওই বাঁধে আর জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস ঠেকছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ভোলায় চলতি বছর জোয়ারের উচ্চতা সাড়ে ৪ মিটারের ওপর উঠেছে। অনেক স্থানে বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। এ অবস্থায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ করবে বলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বাঁধের উচ্চতা হবে প্রায় ৬ মিটার। এ বাঁধের গায়ে পাটা ব্লক (ফোল্ডার) দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তীর সংরক্ষণেও ব্লকবাঁধ দেওয়া হবে। এ রকম বাঁধ ভোলায় মাত্র ৩০ কিলোমিটার আছে। বাকি ৩২০ কিলোমিটার বাঁধের গড় উচ্চতা ভূমি থেকে ৩ মিটারের একটু বেশি। এর বেশির ভাগ অংশ চিকন ও ভাঙনকবলিত।

পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বাবুল আখতার বলেন, সরকার যদিও ১০০ বছরের রূপকল্প গ্রহণ করেছে, তারপরও নদীভাঙন প্রতিরোধে ও টেকসই বাঁধ নির্মাণে ভোলায় বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এ মুহূর্তে ৩২০ কিলোমিটার টেকসই জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও ভাঙন প্রতিরোধে ৩০ কিলোমিটার ব্লকবাঁধ নির্মাণ জরুরি। বাঁধের ওপর সার্কুলার মেরিন রোড নির্মাণ করা যায়। তাতে পর্যটকও আসবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

ভোলার প্রবীণ সাংবাদিক আবু তাহের বলেন, বঙ্গবন্ধু ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে ভোলায় এসেছিলেন। সে দিন তিনি উপলব্ধি করেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক বনায়ন করতে হবে। শ্বাসমূলীয় বন। যদিও ১৯৬৬-১৯৬৭ সালে কিছু কিছু শ্বাসমূলীয় বনায়ন উপকূলে শুরু হয়। সেটি ব্যাপক আকারে করার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা ছিল, উপকূল যদি সবুজবেষ্টনীতে ঢেকে দেওয়া যায়, তবে ঝড়-ঝঞ্ঝা-জলোচ্ছ্বাসের গতিরোধ সম্ভব। সেই থেকে মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদী ও সাগর মোহনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে গড়ে ওঠে মিনি সুন্দরবনখ্যাত সবুজবেষ্টনী।

ভোলার উপকূলীয় বন বিভাগের তথ্যমতে, ভোলায় এযাবৎ ১ লাখ ৩০ হাজার একর জমিতে শ্বাসমূলীয় বনায়ন সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশে মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও ভোলায় আছে ৩৩ ভাগ। এ বনায়ন ধ্বংস করছে ভাঙন, ভূমিদস্যু ও জোতদারেরা।

উপকূলীয় বন বিভাগের বন কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে ও মানুষকে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়তে বন বিভাগ মুজিব বর্ষে উপকূলীয় অঞ্চলে ১ কোটি এবং ভোলায় ১ লাখ ৪০ হাজার চারা বিতরণ করেছে। সাগর মোহনায় যেখানে নতুন চর পড়ছে, সেখানে বনায়ন করে সবুজবেষ্টনী গড়া ছাড়াও সরকারকে বছর বছর বসবাসযোগ্য জমি উপহার দিচ্ছে।

default-image

দৌলতখান উপজেলার মদনপুরের ফারুক দৌলত ও মেদুয়া গ্রামের শাহে আলম বলেন, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার চরাঞ্চলে ও বাঁধে আশ্রয় নিচ্ছেন। সরকার দুর্গম চরাঞ্চলে আশ্রয়ণ প্রকল্প, গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করছে। সেখানে মানুষকে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়। নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি। সরকার যদি মূল ভূখণ্ডে বহুতল কলোনি কিংবা টেকসই ঘর নির্মাণ করে দিত, তাহলে মানুষের কষ্ট দূর হতো।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক বলেন, মূল ভূখণ্ডে বহুতল কলোনি নির্মাণ অনেক ব্যয়বহুল। ভাঙন প্রতিরোধ না করে সেটি করাও সম্ভব নয়। তবে উপকূল টেকসই করতে টেকসই ভাঙন প্রতিরোধের বিকল্প নেই।

মন্তব্য পড়ুন 0