বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় ডুবুরিরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে কাজ করেন। স্থানীয় ডুবুরি দলের প্রতিনিধি মো. আবুল কালাম বলেন, গতকাল মঙ্গলবার বাল্কহেডের ইঞ্জিনরুমের ভেতর থেকে তাঁরা দুজনের লাশ উদ্ধার করেন। ইঞ্জিনরুম ছাড়া বাল্কহেডটির অন্য কোনো অংশে ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। বিদেশি জাহাজের সঙ্গে ধাক্কায় বাল্কহেডটির ব্রিজ ভেঙে দুমড়েমুচড়ে গেছে। এ জন্য সেখানে ঢুকে তল্লাশি চালানো যাচ্ছে না। তাই উদ্ধারকাজ স্থগিত করা হয়েছে। নিখোঁজ অন্যদের লাশ বাল্কহেডের ভেতরে আছে, নাকি নদীতে জোয়ার-ভাটার স্রোতের সময় ভেসে গেছে, তা নিয়ে সংশয় আছে বলে জানান তিনি।

এটা বালু পরিবহনের কার্গো, মালবাহী না। তবে মাল তো সব বাল্কহেডই নেতেয়াছে। বালুবাহী যত বাল্কহেড, সবাই মাল নেতেয়াছে। এতে তো কোনো বাধা নাই। সবাই নিয়ে আসছে, এখনো নেয়। সেইভাবেই এটায় কয়লা তোলা হইছিল।
মানিক মৃধা, ডুবে যাওয়া এমভি ফারদিন-১ ভাড়া নিয়ে চালানো ব্যক্তি

নিখোঁজ তিনজনের দুজনের বাড়ি পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি এলাকার। ওই এলাকা থেকে মোংলায় তাঁদের খোঁজে আসা স্বজন নান্না মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার শ্যালক মো. রবিউল (১৮) ও চাচাশ্বশুর মহিউদ্দীন (৬০) ডুবে যাওয়া ওই বাল্কহেডে চাকরি করতেন। তাঁদের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি। পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া এলাকার মানিক মৃধা নামের এক ব্যক্তি তাঁদের ওই বাল্কেহেডে মাসিক বেতনে চাকরিতে নেন। জাহাজ ডুবে তাঁরা দুজনই হয়তো মারা গেছেন। কিন্তু এখন কি আমরা লাশটাও পাব না?’

বাল্কহেডটি ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করা মানিক মৃধা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ডুবুরিদের উদ্ধারকাজ সকালে স্থগিত করা হয়। নিখোঁজ পাঁচজনের মধ্যে গতকাল সন্ধ্যায় পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি এলাকার নূর আলম ও মোংলার সামসুর লাশ পাওয়া যায়। তবে বাল্কহেডের সুকানি মহিউদ্দীন, তাঁর ছেলে রবিউল এবং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার জিহাদ ওরফে জিসান এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

নিখোঁজ দুজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় বাগেরহাটের মোংলা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গতকাল মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে। বন্দরের ডেপুটি হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. শাহাদাত হোসেনকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ থেকে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। বাল্কহেডটি তুলতে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য মালিকপক্ষ আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে। তারা এরই মধ্যে ডুবুরিদের মাধ্যমে উদ্ধারের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে।’

চলছে অবৈধভাবে পণ্য পরিবহন

ডুবে যাওয়া বাল্কহেডটির মালিক মো. ফজলুল হক খোকন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি জাহাজটি মানিক মৃধা নামের এক চাতালমালিকের কাছে ভাড়া দিয়েছিলাম। চার দিন আগেও তাঁরা আমাকে জানিয়েছিলেন, বরিশাল এলাকায় সিলেট থেকে বালু পরিবহনের কাজ করছে। কিন্তু পরে জানতে পারি, হাড়বাড়িয়ায় কয়লা নিয়ে ডুবে গেছে। এটি তুলতে ঢাকার একটি বেসরকারি উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। তাঁদের ডুবুরিরা কাজ করছেন। আশা করছি, কাল থেকে কয়লা অপসারণের কাজ শুরু করা হবে। এরপর অন্য দুটি বার্জের সাহায্যে টেনে তোলা হবে।’

ফজলুল হক দাবি করেন, তাঁকে না জানিয়ে ভাড়া নেওয়া চাতালমালিক মানিক মৃধা বালু পরিবহনের বাল্কহেডটিতে কয়লা পরিবহন করছিলেন।

বসুন্ধরা গ্রুপের আমদানি করা কয়লা নিয়ে ডুবে যাওয়া বাল্কহেড এমভি ফারদিন-১ ছাড়াও গত সোমবার আরও কয়েকটি বাল্কহেড অবৈধভাবে কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফারদিন ছাড়াও সেদিন মার্জিন, এমভি মা ও নিলয়-৩ নামের বাল্কহেডে কয়লা বোঝাই করে খালাস করা হয়। অথচ কয়লা বহনের অনুমোদন ছিল না এগুলোর কোনোটির।

এ বিষয়ে কয়লা বহনকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ক্যারিয়ারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডুবে যাওয়া এমভি ফারদিন-১ ভাড়া নিয়ে চালানো মানিক মৃধার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা বালু পরিবহনের কার্গো, মালবাহী না। তবে মাল তো সব বাল্কহেডই নেতেয়াছে। বালুবাহী যত বাল্কহেড, সবাই মাল নেতেয়াছে। এতে তো কোনো বাধা নাই। সবাই নিয়ে আসছে, এখনো নেয়। সেইভাবেই এটায় কয়লা তোলা হইছিল।’

এ বিষয়ে হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দীন বলেন, ‘বাল্কহেডে করে পণ্য পরিবহনের কোনো অনুমতি নেই। আমরা মাঝেমধ্যেই এগুলো ধরি। তবে রাতে অনেক সময় আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু এমন কিছু বাল্কহেড দক্ষিণে চলে আসে। তাদের অনুমতি আছে বন্দর চ্যানেলের উত্তরে কেবল বালু পরিবহনের। আমরা বন্দর চ্যানেল নিরাপদ রাখতে বন্দর ব্যবহারকারী ও নৌযানের মালিকদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। তাঁদের অনুরোধ করেছি, ফিটনেসবিহীন, মাস্টার বা যোগ্য নাবিকবিহীন এবং অননুমোদিত কোনো নৌযান যেন তাঁরা পণ্য পরিবহনে ব্যবহার না করেন। একই সঙ্গে জাহাজে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনসহ যেসব কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, তা প্রতিরোধে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও কোস্টগার্ড যেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বন্দরের স্বার্থেই সবাইকে এই নিয়ম মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে আমরা আরও কঠোর হচ্ছি। নৌপরিবহন অধিদপ্তরও এ বিষয়ে কাজ করছে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন