এখন আর কাজ করতে পারেন না আকালীরা

বিজ্ঞাপন
default-image

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর-বামনপাড়া এলাকার আকালী বেগম (৬০)। ১৫ থেকে ২০ বছর পাথর ভাঙার কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। এখন শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। কাজ আর করতে পারেন না।

শুধু আকালী নন, দীর্ঘদিন পাথর ভাঙার কাজ করে ভজনপুর এলাকার সফিউল ইসলাম (৬২), আবদুল জলিলসহ (৬১) অনেকে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তেঁতুলিয়ার প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক পাথর ভাঙার সঙ্গে যুক্ত।

চিকিৎসকেরা বলছেন, পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা না থাকায় বেশির ভাগ শ্রমিকই মুখে কাপড় (মাস্ক) বাঁধেন না। এতে পাথর ভাঙার মেশিন থেকে বের হওয়া গুঁড়া বাতাসের সঙ্গে মিশে শ্রমিকদের নাকেমুখে ঢুকছে। ফলে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন তাঁরা। আক্রান্ত হতে পারেন মরণব্যাধি সিলিকোসিস রোগে।

পঞ্চগড় সদর হাসপাতালের সাবেক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মোশারফ হোসেন বলেন, পাথর ভাঙার মেশিনে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে অনেকের নাক-মুখ দিয়ে পাথরের গুঁড়া ঢুকছে। এই গুঁড়া ভেতরে গিয়ে সিলিকোসিস রোগ হতে পারে। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া মেশিনের শব্দে শ্রমিকদের শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে। শ্রমিকদের মাস্ক ব্যবহার জরুরি। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত চিকিৎসক দিয়ে স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও সেবা নিশ্চিত করা দরকার।

তেঁতুলিয়ার ভূগর্ভ থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানিও করা হয়। তেঁতুলিয়ার ভজনপুর থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এলাকা পর্যন্ত পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের দুই পাশে এসব পাথর মেশিনে ভাঙান ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি ভজনপুর থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে পাথর ফেলে ভাঙানো হচ্ছে মেশিন দিয়ে। মেশিন থেকে বের হওয়া সাদা ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। বিবর্ণ হয়ে পড়েছে আশপাশের গাছের পাতা ও বাড়িঘর।

শ্রমিকেরা জানান, পাথর ভাঙার মেশিনে কাজ করা একেকজন নারী দৈনিক মজুরি পান ৩০০ টাকা। আর পুরুষেরা পান সাড়ে ৩০০ টাকা। এ ছাড়া বড় বড় পাথর হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে মেশিনে দেওয়ার উপযোগী করে দেওয়া পুরুষ শ্রমিকেরা দৈনিক মজুরি পান ৫০০ টাকা।

বোদা উপজেলার মাড়েয়া থেকে বাংলাবান্ধায় কাজ করতে আসা সবুরা বেগম (৪২) বলেন, ‘পেটের দায়ে কাজ করছি। ভবিষ্যতে কী হবে জানা নেই। তবে মাঝে মাঝে শরীরে ব্যথা, জ্বর হয়। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তখন একটু-আধটু বিশ্রাম নিই।’
একই এলাকার সাহেরা বেগম (৩৬) বলেন, ‘এখানে কাজ করে অনেক সময় কাশি হলে কফের সঙ্গে ধুলা বের হয়। মাঝে মাঝে বুক, পেট ব্যথা করে, মাথা ঘোরে। তখন ওষুধ কিনে খাই।’

জানতে চাইলে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের জাহাঙ্গীর ব্রাদার্স নামের পাথর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের মাস্ক ও স্যালাইন সরবরাহ করে থাকি। তবে অনেক সময় গরমের কারণে তাঁরা মাস্ক পরতে পারেন না। দেখা যায় দীর্ঘক্ষণ মাস্ক ব্যবহার করে মুখ ঘেমে গিয়ে সাদা হয়ে যায় এবং ইনফেকশন হয়।’

আরেক পাথর ব্যবসায়ী ফয়েজ হাসান বলেন, ‘আমাদের এখানে যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তাঁদের মাস্ক ব্যবহারে উৎসাহিত করি। অনেকেই ব্যবহার করেন, আবার অনেকেই করেন না।’

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, স্থলবন্দর এলাকার সড়কটি ধুলামুক্ত করার জন্য বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ গাড়ির মাধ্যমে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে পাম্প বসিয়ে পানি ছিটানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট পাথর ভাঙার অঞ্চল স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

জানতে চাইলে সিভিল সার্জন নিজাম উদ্দীন বলেন, পাথর ভাঙার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার জন্য জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন:

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন