বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই গ্রামে ঢুকেই বোঝা যায়, নয়া মিয়ার জন্য এখনো শোকে কাতর গ্রামের লোকজন। ফজলু মিয়া (৪৫) বলেন, নয়া মিয়া চাচা খুব ভালো লোক ছিলেন। গ্রামের মানুষের বিপদের কথা শুনলে পাশে এসে দাঁড়াতেন। আল্লাহ ভালো মানুষকে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখেন না। যেদিন বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়া শুরু হলো সেদিন নিজের জীবন বাজি রেখে গ্রামের মানুষকে বাঁচাতে এসে নিজেই নদীতে তলিয়ে গেল। আমরা দেখলাম কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না।’ এক পর্যায়ে আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, এমন ভালো মানুষটার বেঁচে থাকা উচিত ছিল। আহা জীবন!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নয়া মিয়া স্ত্রী মোছাম্মদ বেগম (৪০), ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া ছেলে জিয়ারুল ইসলাম ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে আকলিমা খাতুনকে রেখে গেছেন। এই প্রতিবেদককে দেখে কাঁদতে থাকেন মোছাম্মদ বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ভালো মানুষক দুনিয়াত থোয় না। মোর স্বামী তো উপকার কইরবার গেছল। ভালো কাজের ফল পানু, মুই স্বামী হারানু। এ্যালা মুই ছোট ছাওয়াগুলাক নিয়া কেমন করি বাঁচিম। ওমাক কি খাওয়াইম, কি দিয়া পড়াইম।’

এলাকার লোকজনের অভিযোগ, ভারত গজলডোবা ব্যারাজের সব কটি দরজা গত ২০ অক্টোবর পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ খুলে দেওয়ায় তিস্তা নদীতে পানি বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়। এতে গঙ্গাচড়ার পশ্চিম ইচলী গ্রাম রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে দেওয়া ওই বাঁধ ভেঙে ১০ মিনিটের মধ্যেই গ্রামের ২০টি পরিবারের অন্তত ৩৫টি বসতঘরের আসবাবপত্র, জামা কাপড়, গরু-ছাগল–হাঁস-মুরগি স্রোতে ভেসে যায়।

ওই গ্রামের পাশে তিস্তা নদীর কিনারায় গত বৃহস্পতিবার বিকেলে গালে হাত দিয়ে বসে নদীর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন রাজিয়া বেগম (৫০)। জানা গেল, ৮ অক্টোবর তিস্তায় গোসল করতে নেমে তাঁর স্বামী পানিতে ডুবে মারা গেছেন। কুলখানি করার জন্য ২০ হাজার টাকা, চাল-ডাল, ছাগল, খড়ি সংগ্রহ করেছিলেন। ২০ অক্টোবরের বন্যায় বাঁধ ভেঙে তাঁর দুটি ঘর, একটি টিনের চালাসহ সব কিছু ভেসে গেছে। কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি।

রাজিয়া বেগম বলেন, ‘এই নদীটায় মোর স্বামীক খাইছে। মুই বিধবা হনু। মোর থাকার আশ্রয়টাও কাড়ি নিছে। এ্যালা খালি মোর জানটা নিবার বাকি থুইচে।’

সেদিনের কথা মনে করে পশ্চিম ইচলীর ছাইয়াদুল ইসলাম (৩৭) বলেন, ‘ওই দিন ছিপছিপানি ঝড়ি আর ঠান্ডা বাতাসোত শরীলটা হিম হয়া আলছিলো। ঘর থাকি বেরার পাও নাই। হঠাৎ হু হু শব্দ করি বাঁধটা ভাঙি গেল। ঘর থাকি বেরাইতে না–বেরাইতে সউগ ভাসি নিয়া গেল। আঙিনা থাকি কোনো রকম বউ ছাওয়াক সাঁতার কাটিয়া বাঁছাছু। চোখের সামনোত ঘরবাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, গরু, ছাগল ভাসি গেইছে।’

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, ওই দিন পশ্চিম ইচলীর স্বেচ্ছাশ্রম বাঁধ ভেঙে ২০টি পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ভেসে গেছে তাঁদের গরু, ছাগল, নগদ টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। বসতভিটা বিলীন হওয়ায় গরিব মানুষগুলোকে পুনর্বাসন করা দরকার। শুনেছি ওই গ্রামের নয়া মিয়া পরোপকারী মানুষ ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পরে পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন