আক্ষেপের সুরে হৃদয় মণ্ডল বলেন, ‘আমাকে বিনা অপরাধে ১৯ দিন জেল খাটতে হয়েছে। এ ১৯টি দিন আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন ছিল। আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছিল। আমি অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম। কষ্ট ভোলার চেষ্টা করছি। ঠিক এমন সময় আবার অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় যে জুতার মালা পরানোর ভিডিও দেখলাম।’

সেদিন পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে কলেজ ক্যাম্পাসে অধ্যক্ষ স্বপন কুমারের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে পড়েছেন বলে জানান হৃদয় মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে এর চেয়ে ঘৃণা, কষ্টের কী হতে পারে! সাভারের শিক্ষক হত্যার ঘটনা, অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোসহ দেশের সব জায়গায় যেভাবে ভালো শিক্ষকদের বেছে বেছে আঘাত করা হচ্ছে, এতে আমার ভেতরে আরও বেশি ভয় কাজ করছে। আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

এখনই এ বিষয়ে সরকারকে কঠোরভাবে নজর দেওয়ার দাবি জানিয়ে হৃদয় মণ্ডল বলেন, এমনটা চলতে থাকলে দেশে ভালো শিক্ষকের সংকট দেখা দেবে। ভালো মানুষেরা শিক্ষক হবেন না। নতুন প্রজন্মকে ভালো মানুষ বানানো যাবে না।

গত ২০ মার্চ দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের ক্লাস নিচ্ছিলেন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল। সেখানে বিজ্ঞান ও ধর্ম বিষয়ে তাঁর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কয়েকজনের পক্ষে-বিপক্ষে কথোপকথন হয়। এক শিক্ষার্থী ওই কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করে। সেই ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়। এ ঘটনায় মামলাও করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। সেই মামলায় ১৯ দিন জেলে থাকার পর ১০ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পান হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল। ১১ এপ্রিল মাউশি সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল হাই তালুকদারকে প্রধান করে এক সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ২০ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সেখানে হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের প্রমাণ পায়নি কমিটি।

হৃদয় মণ্ডল জানান, তাঁর মামলাটি এখনো আদালতে চলমান। গত ২০ এপ্রিল, ২৪ মে এবং গতকাল মঙ্গলবারও আদালতে হাজির হয়েছেন তিনি। এই তিনটি তারিখে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। তবে আজ বুধবার পুলিশ তাঁকে ডেকেছে। দুই-এক দিনের মধ্য অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাঁকে।

default-image

হৃদয় মণ্ডল বলেন, জামিনে আসার পর তাঁর বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে কারা যেন ‘পিঠের চামড়া তুলে নেওয়ার’ হুমকি দিত। গেটের বাইরে এসে কাউকে খুঁজে পেতেন না। গেটে লাথিও দিত। এক মাস আগে একটি অপরিচিত মুঠোফোন নম্বর থেকে ফোন করে তাঁর মেয়েকে অপহরণ করার হুমকি দেওয়া হয়। ১০–১২ দিন আগেও গেটে লাথি মেরে তাঁকে গালাগাল করা হয়। বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি।

হৃদয় আরও মণ্ডল বলেন, ‘কেউ গেটে লাথি দিলে আমি আর এখন ঘর থেকে ভয়ে বের হই না। স্কুলের সামান্য বেতনে চলতে কষ্ট হতো। বাড়তি আয়ের জন্য বাড়িতে ছেলেমেয়েদের পড়াতাম। এখন ভয়ে সেটিও করি না। সব মিলিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে আমার।’

২৪ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন হৃদয় মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘আর ৫ বছর ৮ মাস শিক্ষকতা চাকরির সময়সীমা আছে। আমার এখানে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের সঙ্গে যেসব ঘটনা ঘটছে, জানি না কত দিন শিক্ষকতা করতে পারব। কত দিন নিরাপদে থাকতে পারব।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন