বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশার দুর্গাসাগর দিঘি
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশার দুর্গাসাগর দিঘিসাইয়ান

দুর্গাসাগর দিঘির ঐতিহ্য ২৪০ বছরের। মনোরম পরিবেশের দিঘিতে আসা অতিথি পাখিদের অবাধ বিচরণ সাধারণ মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করত। সেই পাখি আসা বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হতশ্রী রূপ পাওয়া দুর্গাসাগর দিঘি আবারও যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। সংস্কারের পাশাপাশি দিঘি ঘিরে নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দক্ষিণের পর্যটনের যেন নতুন সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে।

বরিশাল শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে বরিশাল-স্বরূপকাঠি আঞ্চলিক সড়কের পাশে বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের মাধবপাশা গ্রামে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর দিঘি অবস্থিত। দিঘিটির জলাভূমির আয়তন ২৭ একর। এর চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন বৃক্ষশোভিত বন। সব মিলিয়ে দুর্গাসাগরের আয়তন ৪৫ দশমিক ৪২ একর। দিঘির মাঝেই রয়েছে গাছগাছালিতে ছাওয়া দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ।

এবারই প্রথম এই দিঘিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়েছে শ্রেতপদ্ম। দিঘিটির দক্ষিণ দিকের বিশাল অংশজুড়ে ফুটেছে এই পদ্ম, যার মোহনীয় সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে দর্শনার্থীরা প্রতিদিন ভিড় করছেন এখানে। দিঘির দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক তপন লাল লস্করের ভাষায়, বর্ষার শুরুতেই দিঘির বিস্তীর্ণ অংশে ফোটা সাদা পদ্ম দেখে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। পাপড়ি মেলে প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বাগত জানায় জলজ ফুলের রানি পদ্ম।

প্রতিদিন সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন পর্যটন আসছেন। শীত মৌসুমে তা দ্বিগুণ-তিন গুণ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। কয়েক বছর আগে গড়ে ৫০ জন দর্শনার্থীও টিকিট কেটে প্রবেশ করতেন না।
বিজ্ঞাপন
default-image

শুধু শুভ্র পদ্ম নয়, দিঘিকে ঘিরে নানামুখী উন্নয়নে পাল্টে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর দিঘির চিত্র। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত বছর দিঘিটি সংস্কারের কাজ শুরু করা হয়। এতে দিঘিতে সুপরিসর জরাজীর্ণ দুটি ঘাট সংস্কার করে আরও দৃষ্টিনন্দন করা হয়। এ ছাড়া পিকনিক বা অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ, দিঘির পানিতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য প্যাডেল বোট ও নৌকা সংযোজন করা হয়। এ ছাড়া বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের ব্যবস্থা, দিঘির পাড়ে বসার জন্য ছাউনিযুক্ত বেঞ্চ ও সাধারণ বেঞ্চ, গণশৌচাগার ও রেস্ট হাউস নির্মিত হয়। সার্বক্ষণিক সিসিটিভির আওতায় থাকা দিঘি এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে নানা জাতের বৃক্ষশোভিত বাগান। দিঘিতে অবমুক্ত করা হয় অসংখ্য হাঁস। দিঘির স্বচ্ছ পানিতে শাপলা ও পদ্মের সমারোহ যে কাউকে মোহিত করে।

এ ছাড়া পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে এখানে সংযোজন করা হয়েছে হরিণ, বানর, কবুতর ও বিভিন্ন প্রজাতির শৌখিন পাখি। পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে বাঘ-হরিণের ম্যুরাল। গত দেড় বছরে দুর্গাসাগরের পশ্চিম পাড়ের গেট–সংলগ্ন চত্বর সংস্কার এবং ঐতিহ্যবাহী বটমূলের সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে। প্রবেশ গেট মেরামত ও সৌন্দর্যবর্ধন, ইলেকট্রনিক নামফলক স্থাপন, দিঘিতে বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্য অবমুক্তকরণ, পুরো দুর্গাসাগর এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ স্থাপন, সৌরবিদ্যুতের সুবিধা সংযোজন, ওয়াকওয়ের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য মাটি ভরাটসহ নানা কর্মযজ্ঞে চেহারা পাল্টে গেছে এই দিঘির।

default-image

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের পঞ্চদশ রাজা শিবনারায়ণের খনন করা ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর দিঘি সাধারণ মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করত শীতের সময় আসা অতিথি পাখিদের অবাধ বিচরণের কারণে। তবে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর পাখিদের বিচরণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। পাশাপাশি দিঘির রক্ষণাবেক্ষণ না করায় দুর্গাসাগর তার পুরোনো জৌলুস হারাতে থাকে। এতে পুরো এলাকা অনেকটাই পর্যটকশূন্য হয়ে বখাটে আর মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়।

default-image

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের দিকে দুর্গাসাগরের অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজে হাত দেয় জেলা প্রশাসন। তবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক বদলি হয়ে যাওয়ার পর সে কাজ আর বেশি দূর এগোয়নি। বরিশালের বর্তমান জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর পুনরায় দুর্গাসাগরের শ্রীবৃদ্ধি প্রকল্পে গতি পায়। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে দেড় বছর ধরে দুর্গাসাগরকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে নানামুখী প্রকল্প চলে। গত দেড় বছরে দুর্গাসগরের আমূল পরিবর্তন আসায় সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী দিঘিটি।

দিঘিটির পরিচালনাকারীরা জানান, ২০ টাকার টিকিটে বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর দিঘির সৌন্দর্য অবলোকন করতে গড়ে প্রতিদিন সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন পর্যটন আসছেন। আসন্ন শীত মৌসুমে তা দ্বিগুণ-তিন গুণ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও এখানে গড়ে ৫০ জন দর্শনার্থীও টিকিট কেটে প্রবেশ করতেন না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ধীরে ধীরে পর্যটকমুখর হয়ে উঠছে দুর্গাসাগর। এর ফলে বাণিজ্যের প্রসারসহ স্থানীয় লোকজনও সুফল পেতে শুরু করেছেন। আর প্রকৃতির কথা চিন্তা করে দিঘির উন্নয়নে এ বছর এখানে কিছু অতিথি পাখির আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে শীত শুরু হলে প্রচুর অতিথি পাখির দেখা মিলবে এবার। ভবিষ্যতে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হলে এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।

default-image

বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ দিঘির সার্বিক উন্নয়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দিঘিতে বিপুল পরিমাণে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছাড়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি গত দেড় বছরে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৭০০ হাঁস, কয়েক শ কবুতর ও অন্যান্য পাখি সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে পাখিদের আকৃষ্ট করতে ফলদ গাছের বনায়নও করা হয়েছে। গাছে হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই দিঘিকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় পর্যটন সম্ভাবনা থাকায় এটিকে নানাভাবে উন্নয়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0