প্রথম আলো: এর আগে একাধিক মৃত ডলফিন, রাজকাঁকড়া ভেসে এসেছে। এগুলো মারা যাওয়ার কারণ কী?

কামরুল ইসলাম: বাংলাদেশের সাগরসীমায় সাধারণত লম্বা ঠোঁটবিশিষ্ট হ্যামব্যাক (Sousa plumbea) ও অস্পষ্ট বা ছোট ঠোঁটবিশিষ্ট ইরাবতী (Orcaella brevirostris) ডলফিনের দেখা মেলে। জেলেদের জালে ডলফিন আটকা পড়লে জেলেরা ঠিকভাবে তা না ছাড়িয়ে প্যাঁচানো জালসহ কেটে দেয়। এতে ডলফিন মরে যায়। গভীর সমুদ্রে মাছের প্রাচুর্য যেখানে বেশি থাকে, সেখানে ডলফিনের বিচরণও বেশি থাকে। জেলেরা মাছ ধরার সময় ট্রলারে থাকা শক্ত কোনো দণ্ড দিয়ে ডলফিনের গায়ে আঘাত করে থাকে। এতেও ডলফিন মারা যায়। শুশুক বা ডলফিন সামুদ্রিক দূষণের কারণেও মারা যেতে পারে। বাংলাদেশের গভীর সাগরে টিকিপ্লিয়াস গিগাস এবং উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, কুয়াকাটা, কক্সবাজার, সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ও ম্যানগ্রোভসদৃশ অঞ্চলে কারসিনোস্করপিয়াস রোটানডিকডা শ্রেণির রাজকাঁকড়া পাওয়া যায়। এগুলোর নাম কাঁকড়া হলেও আসলে এগুলো কাঁকড়া নয়; বাস্তবে এগুলো সামুদ্রিক অ্যারাকনিড প্রাণী। টিকিপ্লিয়াস গিগাস কাঁকড়া বালুময় সৈকতে ডিম দেয় কিন্তু কারসিনোস্করপিয়াস রোটানডিকডা কাঁকড়া কর্দমাক্ত এলাকায় ডিম দেয়। এগুলো ৭-৯ বছর পর্যন্ত, অর্থাৎ সাগরে যাওয়া পর্যন্ত মোহনা ও নদীর কাদার মধ্যেই বসবাস করে এবং প্রায় ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। ডিম দেওয়ার জন্য বালুচরে মোহনা বা নদীর কাদাযুক্ত তলদেশে যাতায়াত করার কারণে অথবা মাছ ধরার জালে আটকে রাজকাঁকড়া মারা যেতে পারে। আবার ডিম দেওয়ার সময় এসব জলজ প্রাণী মানুষের শিকারেও পরিণত হতে পারে।

প্রথম আলো: কয়েক দিন আগে কুয়াকাটা সৈকত ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় লাখ লাখ জেলিফিশ ভেসে আসে। এসব পরিবেশ বিপর্যয়ের কোনো আলামত?

কামরুল ইসলাম: জেলিফিশ মলাস্ক, কাঁকড়া, ছোট মাছ, শৈবাল, প্লাঙ্কটনজাতীয় খাবার খেয়ে থাকে এবং সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের খাদ্যের আধিক্য থাকায় খাবারের খোঁজে সেখানে গিয়ে জালে আটকা পড়ে মারা যায়। এগুলোর দেহ থকথকে নরম ৫ ভাগ জিলেটিন প্রোটিন ও ৯৫ ভাগ পানি দিয়ে গঠিত। দেহে হাড়, মস্তক, মেরুদণ্ড না থাকায় বালুচরে জোয়ারের পানিতে উঠে পড়লে আটকা পড়ে যায়। আবার সমুদ্রে ফিরে যেতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেলে, অক্সিজেন কমে গেলে কিংবা রাসায়নিকভাবে পানিদূষণের ঘটনা ঘটলে জেলিফিশ মারা যেতে পারে। সামুদ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ের কোনো কারণ বা লক্ষ্য এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন বিপর্যয়ের কোনো কারণও নেই।

প্রথম আলো: সামুদ্রিক এসব প্রাণী রক্ষায় মৎস্য অধিদপ্তরের মেরিন ফিশারিজ বিভাগের কী ভূমিকা আছে?

কামরুল ইসলাম: বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক শাখা অবস্থিত। উপকূলীয় সব এলাকার মৎস্য অধিদপ্তরের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপকূলীয়, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।

প্রথম আলো: যেসব সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাচ্ছে, তার জন্য ফরেনসিক পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা আপনারা করবেন?

কামরুল ইসলাম: প্রায়ই কুয়াকাটা এলাকায় সামুদ্রিক প্রাণী মারা যায়। তাই ভবিষ্যতে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের (এসসিএমএফপি) মাধ্যমে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নির্দেশনা সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রথম আলো: সামুদ্রিক এসব প্রাণী রক্ষা করা এবং মারা যাওয়া বন্ধে কী করা যায়?

কামরুল ইসলাম: সমুদ্রে নিয়োজিত সুফলভোগী গোষ্ঠী বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়, নেভিগেশনে জড়িত জনগোষ্ঠী (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক) এবং উপকূলীয় এলাকার জনগোষ্ঠীকে সমুদ্রদূষণের কারণ ও প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে ধারণা প্রদান এবং ব্যাপক জনসচেতনতার সৃষ্টি করা। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে সামুদ্রিক প্রাণী ডলফিন, হাঙর, কচ্ছপ, তিমি ইত্যাদি রক্ষায় গভীর সমুদ্রে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে মেরিন প্রটেকটিভ এলাকা ঘোষণা করেছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

প্রথম আলো: সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষায় বন্য প্রাণী আইন অনুযায়ী বন বিভাগেরও দায়িত্ব আছে। মৎস্য বিভাগ তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে পারে?

কামরুল ইসলাম: প্রতিটি সরকারি দপ্তর আইন ও কার্যপ্রণালি বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়। এ ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর ও বন বিভাগ নিজ নিজ দপ্তরের সিটিজেন চার্টার মোতাবেক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু কিছু বিষয় সরকারি পলিসির মধ্যে পড়ে। মৎস্য অধিদপ্তর ও বন বিভাগের একত্রে কাজ করার বিষয়ও সরকারি পলিসি লেভেলের সিদ্ধান্তের মধ্যে পড়ে, তাই মন্তব্য করতে পারছি না। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উপকূলীয় ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য সৃষ্টি। ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার সুন্দরবন এলাকার মধ্যে ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার নদীনালা, খাড়ি ও বিল অঞ্চল। সুন্দরবনে জালের মতো জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতোধারা, কাদাচর, ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ছোট আকারের দ্বীপমালা। এসব অঞ্চলে কচ্ছপ, ডলফিন, রাজকাঁকড়া, কুমিরসহ অন্যান্য সামুদ্রিক ও উপকূলীয় প্রাণী বিচরণ করে। তাই সুন্দরবন অঞ্চলে মৎস্য অধিদপ্তরের অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতা কাজে লাগাতে পারলে মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণে ইতিবাচক ফল আসবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন