default-image

মধুরামপুর গ্রামের আইয়ুব আলীর বসতভিটা ছাড়া কোনো জমি ছিল না। অন্যের জমিতে মজুরি খেটে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। এক বেলা খাবার জুটলেও আরেক বেলা খাবার জুটত না। ১০ বছর আগে আইয়ুব আলীর অবস্থা ছিল এ রকম। কিন্তু আজ তাঁর দিন বদলে গেছে। এখন তিনি একজন সফল করলাচাষি এবং টিনের বাড়ি, আবাদি জমির মালিক। অনেক কৃষকের পথপ্রদর্শকও।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের মধুরামপুর গ্রামে আইয়ুব আলীর বাড়ি। কাঁচা-পাকা পথ ধরে তাঁর বাড়িতে যাওয়ার সময় মাঠজুড়ে অসংখ্য করলাখেতের মাচা নজর কাড়ে। বাড়ির আঙিনা, ঘরের চাল, উঠানের পাশে সর্বত্র করলা। কেউ খেত থেকে করলা তুলছেন, কেউ করছেন খেতের পরিচর্যা।

আইয়ুব আলীর বাড়িতে পৌঁছে দেখি সুনসান অবস্থা, কেউ নেই। খটকা লাগে, কিছুটা হতাশও হই। খোঁজ করতেই একজন দেখিয়ে দেন, ‘ওই যে আইয়ুব আলী করলাখেতে কাজ করছেন।’ কিছু দূর এগোতেই দেখা যায়, নিজের করলাখেত পরিচর্যা করছেন আইয়ুব আলী। পরিচয় জেনে জমি থেকে আলে উঠে আসেন। শোনান করলা চাষের গল্প।

বিজ্ঞাপন

১৯৮০ সালে জন্ম আইয়ুব আলীর। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবার অভাবের সংসার, তাই লেখাপড়া করা হয়নি। কাজ পেলে খাবার জুটত, না পেলে অনাহারে থাকতে হতো। তাঁর কষ্টের কথা শুনে ২০১০ সালে পাশের ভীমপুর গ্রামের অদূত মিয়া কিছু করলাবীজ তাঁর হাতে দিয়ে জমিতে লাগানোর পরামর্শ দেন। এ বীজ আইয়ুব আলী ৬ শতক বসতভিটার চারদিকে লাগান। ৬০ দিনের মাথায় করলা ধরে। বিক্রি করে আয়ও হয় ৪ হাজার ৫০০ টাকা। এরপর পুরোপুরি করলা চাষে লেগে পড়েন তিনি। প্রথম বছরের লাভের টাকা দিয়ে পরের বছরে অন্যের ২৫ শতক জমি বর্গা নেন। এবারও তাঁর করলার ফলন ভালো হয়। বসতভিটাসহ ৩১ শতক জমির করলা বিক্রি করে আয় করেন ১৫ হাজার টাকা।

এভাবে একপর্যায়ে চাষের জমি বাড়ে, আয় বাড়ে। দিনমজুর থেকে আইয়ুব আলী হয়ে ওঠেন সফল করলাচাষি। কেনেন ৪০ শতক জমি, বানান টিনের বাড়ি। তাঁর দুই সন্তান হাসানুর রহমান ও বাদল রহমান স্কুলে পড়ছে। স্ত্রী শাহিদা বেগম আর আইয়ুব আলী লেগে আছেন করলা চাষে। এবার দুই একরে করলা চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে এক লাখ টাকার করলা বিক্রিও করেছেন। এখনো খেতে যে পরিমাণ করলা আছে, তা বিক্রি করলে আয় হবে আরও এক লাখ টাকার বেশি।

করলা চাষে আইয়ুব আলীর সাফল্য গ্রামের আরও কিছু দরিদ্র মানুষের ভাগ্যবদলে সহায়ক হয়েছে। এ রকম আরেকজন কৃষক মফিজার রহমান। ছয় বছর আগেও গ্রামের মফিজার রহমানকে সবাই দিনমজুর হিসেবে জানতেন। তাঁর সহায়-সম্বল বলতে ছিল ৪ শতক জমির ওপর ছোট্ট একটা খড়ের ঘর। এলাকায় কাজ না থাকায় তাঁকেও প্রায়ই উপোস থাকতে হতো। কিন্তু এখন মফিজারের ঘরে সারা বছরের চাল থাকে। কামলাও খাটতে হয় না। ২৫ শতক জমি বর্গা নিয়ে করলা চাষ শুরু করে তিনিও টিনের বাড়ি করেছেন। নিজের কেনা ৪৫ শতক জমিতে এবারও করেছেন করলা চাষ।

প্রতিবছরের মতো এবারও দেড় একর জমিতে করলা চাষ করেছেন গ্রামেরই আরেক চাষি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রায় সারা বছরই করলা চাষ করা যায়। লাগানোর ৬০ দিনের মধ্যে করলা পাওয়া যায়। ভাদ্র-কার্তিক মাসে করলার ফলন ভালো হয়। দেশি জাতের পাশাপাশি এখন উচ্চফলনশীল বিদেশি জাতের করলার চাষ বেশি হচ্ছে।

আলমপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এনামুল হক বলেন, আইয়ুব আলীর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার কৃষকেরা করলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাঊর্মি তাবাসসুম বলেন,এখানকার করলা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার বাজারে যাচ্ছে। এবার আলমপুর ইউনিয়নে ৩২০ একর জমিতে করলা চাষ করা হয়েছে। চাষিদের উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0