করোনায় রিকশাচালকদের কষ্টের জীবন
যাত্রীর অপেক্ষায় বসে আছেন রিকশাচালক জাবেদ মিয়া। তিনি অন্যের রিকশা ভাড়া নিয়ে চালান। মালিককে প্রতিদিন দিতে হয় ৩৫০ টাকা। আজ শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পৌনে ৫টা পর্যন্ত তাঁর আয় হয়েছে ৩৫০ টাকা। রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত চালিয়ে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পাবেন। ওই টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য চাল-ডাল কিনবেন। এখন ডাল-ভাত খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছেন তাঁরা।
আজ বিকেলে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটকের বাইরে জাবেদের সঙ্গে কথা হয়। করোনায় দিন কেমন চলছে জানতে চাইলে জাবেদ বলেন, ‘সুবিধার না। পানি ছাড়া সবই কিননা খাইতে হয়। ডাল-ভাত খেয়ে কোনোরকমে থাকি। শহরে মানুষ নাই। সব বন্ধ। গ্রাম থেইক্যা মানুষ অহন শহরে আয়ে না। গাড়িগোড়া সব বন্ধ। সকালে রিকশা লইয়্যা বাইর হইছি। অহন পর্যন্ত ৩৫০ টাকা রোজগার করতে পারছি। ভাড়ায় রিকশা চালাই। মালিককে দিতে অইব ৩৫০ টাকা। যা থাকব, হেইডা দিয়া পরিবারের লাইগা বাজার করমু।’
জাবেদ আরও বলেন, করোনার কারণে এখন প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা রোজগার হয়। আর আগে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা রোজগার হতো। মালিককে দেওয়ার পর এখন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা থাকে। আর আগে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা থাকত।
জাবেদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঘাটুরা গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রীসহ তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসারে সদস্য ছয়জন। করোনা শুরুর পর থেকে এভাবেই চলে তাঁর প্রতিদিনের টিকে থাকার সংগ্রাম। করোনার কারণে আয়রোজগার কমে যাওয়ায় জাবেদের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের হাজারো রিকশাচালক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক মো. সোলায়মান মিয়ার সংসারে মা-বাবা, স্ত্রী, দুই মেয়ে, তিন বোন ও চার ভাই রয়েছে। সবার খরচ তাঁকে দিতে হয়। সোলায়মান বলেন, ‘আজ সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রিকশা চালাইয়া ৪৫০ টেহা রোজগার হইছে। ভাড়ায় রিকশা চালাই। মালিককে দিতে অইব ৩৫০ টেহা। করোনা ও লকডাউনের কারণে গড় দেটটা (দেড়) বছর ধইরা সংসার চালাইতে কষ্ট অইতাছে। ডাল-ভাত খাইয়া কোনোরকমে দিন কাটাইতাছি।’
আগে মালিকের রিকশার ৩৫০ টেহা ভাড়া দিয়া হাতে ৭০০ থেকে ৮০০ টেহা থাকত। আর অহন ১৫০ থেকে ২৫০ টেহা থাহে
করোনার আগের ও পরের আয়ের তুলনা করে সোলায়মান বলেন, ‘আগে মালিকের রিকশার ৩৫০ টেহা ভাড়া দিয়া হাতে ৭০০ থেকে ৮০০ টেহা থাকত। আর অহন ১৫০ থেকে ২৫০ টেহা থাহে।’ তিনি ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘গত দেড় বছরের কোনো জায়গা থেইক্যা এক টেহা কিংবা এক মুঠ চালের কোনো সহায়তা পাই নাই।’
জেলা শহরের শিমরাইলকান্দি এলাকায় স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে থাকেন সুমন মিয়া। তিনিও ভাড়ায় রিকশা চালান। রিকশা ভাড়া ২৫০ টাকা এবং ব্যাটারির চার্জ বাবদ দিতে হয় ৮০ টাকা। প্রতিদিন রিকশার ভাড়া ও চার্জ বাবদ খরচ যায় ৩৩০ টাকা। তিনি বলেন, ‘আয়রোজগার নাই। ডাল-ভাত খেয়ে থাকি। এখন ১৫০ থেকে বড়জোর ২০০ টাকা রোজগার হয়। আগে (যখন করোনা ছিল না) ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা রোজগার করতে পারতাম।’
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা রিকশাচালক শাওন মিয়া। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে শহরের ফুলবাড়িয়ায় থাকেন। গতকাল বিকেলে শহরের কুমারশীল মোড় এলাকায় যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, তিনি ভাড়ায় রিকশা চালান। এখন প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা রোজগার হয়। আগে রোজগার হতো ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। এখান থেকে আবার মালিককে দিতে হয়।
করোনাকালে রিকশাচালকদের সহায়তা করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পঙ্কজ বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘রিকশাচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে আমরা বিভিন্নভাবে খাদ্যসহায়তা দিয়েছি। এ পর্যন্ত দেড় হাজার রিকশাচালককে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। করোনা শুরুর পর থেকেই আমরা খাদ্যসহায়তা দিচ্ছি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর অনেক রিকশাচালক ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্যসহায়তা চেয়েছেন। তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমি নিজে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দিচ্ছি।’