default-image

কুস্তিগির রাসেল ভূঁইয়ার নাম দশজনে জানে। কুমিল্লার তিতাস উপজেলার মৌটুপি গ্রাম থেকে দূর-দূরান্তে ভাড়ায় কুস্তি আর হা-ডু-ডু খেলতে যান তিনি। তাঁর শরীরে যখন করোনাভাইরাস শনাক্ত হলো, তিনি ভাবলেন তাঁর কুপোকাত হওয়া চলে না। শেষ পর্যন্ত রোগ তাঁকে ছেড়ে পালিয়েছে।

রাসেল ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল শনিবার দুপুরের দিকে। পরপর দুটি পরীক্ষায় ফল এসেছে নেগেটিভ। তবু তখনো ঘরবন্দী হয়েই ছিলেন। তাঁর পরিবারে আরও দুজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। তাঁরাও শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। তবে দ্বিতীয় দফা পরীক্ষার ফল এখনো হাতে পাননি।

কী করে কী হলো? রাসেল বলছিলেন, দেশে প্রথম যখন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেল, তখনই তাঁদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন। ইউনিয়নের তরুণ-যুবকদের নিয়ে ২৭ জনের দল গঠন করেছিলেন।

দলটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঢোকার মুখ বাঁশ দিয়ে আটকে দিয়েছিলেন। নিজ উদ্যোগেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান রেখেছিলেন। নিয়ম করেছিলেন কেউ ঢুকলেও সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, বের হলেও। চায়ের দোকানে আড্ডা হচ্ছে দেখে দোকানগুলোও বন্ধ করিয়েছিলেন।

আবার কড়াকড়ির কারণে যাঁরা কষ্টে পড়েছিলেন, তাঁদের ত্রাণ দিতে প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থসংগ্রহ করছিলেন।

রাসেল ভূঁইয়া, তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা যখন প্রাণপনে গ্রামকে করোনাভাইরাসমুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন এমন এক সময়ে এক ঘটনায় রাসেল তাজ্জব বনে গেলেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমার চাচাতো ভাই লকডাউনের ভিতরে সাইকেল চালায়া ঢাকা থেকে গ্রামে আয়া পড়ছে। আমি নিজে পুলিশের এসআইরে খবর দিছি। কারণ সে অন্যায় করছে।’

কমিটির সবাই মিলে রাসেলের চাচাতো ভাইকে বোঝালেন, বললেন ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে। এক দিন পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রতিনিধি এলেন চাচাতো ভাইয়ের নমুনা নিতে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন রাসেল। হঠাৎ তাঁর হাঁচি শুরু হলো। চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ফয়জুল হক তাঁরও নমুনা নিলেন।পরীক্ষায় রাসেলের চাচাতো ভাই করোনামুক্ত অথচ রাসেল আক্রান্ত।

ঘাবড়ে গিয়েছিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রাসেল বলেন, ‘একটু ভয় ভয় করছিল। তবে আল্লাহর ওপর আস্থা আছে। এক যুগ মদিনায় কাটিয়েছ। ভাবলাম, আয়ু থাকলে এ যাত্রা বেঁচে যাব।’

কীভাবে রিপোর্ট হাতে এল? এ নিয়ে কথা হচ্ছিল মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ফয়জুল হকের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, রাসেল ও তাঁর আত্মীয়স্বজনের নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন নিয়মমতো, সেই সঙ্গে রোগীর নাম-ঠিকানা। সেখান থেকে কুমিল্লা জেলার সিভিল সার্জন হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা সরফরাজ খানের কাছে। পুরোটাই ফোনে আর ই-মেইলে। খবরটা পেয়েই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে। রাসেলও পরিবারের সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান।

আলাদা থাকতেই থাকতেই শোনেন তাঁর স্ত্রী, তাঁর বাবা দুজনই আক্রান্ত। ছোট দুই সন্তান দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। করুণ স্বরে ‘আব্বা’ , ‘আব্বা’ বলে ডাকত। মন শক্ত করে দরজায় খিল দিয়ে বসে থাকতেন রাসেল।

তবে দরজা বন্ধ রাখলেও যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি রাসেল। ফোনে পরিবার ও পরিবারের বাইরের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। সাবেক সেনাসদস্য বাবা, যিনি নিজেও করোনায় আক্রান্ত তিনি ছেলেকে সাহস জোগাতেন, ছেলে জোগাতেন বাবাকে। রাসেল যোগাযোগ রাখছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের সঙ্গেও।

কখনো হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, এমন প্রশ্নের জবাবে রাসেল বলেন, তাঁর শ্বাসকষ্ট ছিল না, জ্বরও না। তবে হাঁচি-কাশি ছিল। পরিবারের আক্রান্ত বাকি সদস্যদেরও জ্বর ছিল না। চিকিৎসকেরা যে ওষুধ দিয়েছেন, ঘরে বসে তাই খেয়েছেন, গরম পানি, গরম চা খেয়েছেন বারবার। গড়গড়া করেছেন গরম পানি দিয়ে।

১৪ এপ্রিল তাঁর প্রথম পরীক্ষাটা হয়। রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। শনিবার দ্বিতীয় পরীক্ষার ফল এসেছে হাতে। অপেক্ষা বাকিদের জন্য।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা সরফরাজ খান প্রথম আলোকে বলেন, রাসেলের সঙ্গে চিকিৎসকেরা যোগাযোগ করেছিলেন। তাঁদের বাড়ি উপজেলার কাছেই। অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত ছিল। শ্বাসকষ্ট শুরু হলেই হাসপাতালে আনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। রাসেল বাসাতেই সুস্থ হয়েছেন।

করোনাভাইরাস ছেড়ে পালিয়েছে, কেমন লাগছে এখন? জানতে চাইলে রাসেল বলেন, তিনি হোমনা-মেঘনা-নারায়ণগঞ্জ- আড়াইহাজার-ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাঞ্ছারামপুর, তিতাসে আবারও খেলবেন, জিতে আসবেন। তবে মহামারিকালে ঘর থেকে আর বেরোবেন না, অন্যরাও যেন বের না হয়, তা-ই চান।

তবে প্রশ্ন থেকে গেছে আরও, রাসেল বা তাঁর পরিবারই মৌটুপি গ্রামে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু তাঁদের আক্রান্ত করল কে?

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন