বিজ্ঞাপন

গ্রাম পুলিশ মো. আজিজুল হকের আহ্বানে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকার শতাধিক নারী-পুরুষ কাঠকাটা লঞ্চঘাট এলাকায় ছুটে আসেন। কেউ কাঠকাটা বাজারের দোকান বন্ধ করে আবার কেউবা বাড়ি থেকে চলে এসেছেন সেখানে। একদল নদীতে নেমে কাদা তুলে বাঁধের ওপর মাটি দিতে শুরু করে। আরেক দল মাথায় মাটির বস্তা নিয়ে বাঁধের কাছে নিয়ে যায়। নারীরা প্লাস্টিকের বস্তায় মাটি ভরে দিচ্ছেলেন। শুধু ওই এলাকার নয়, অন্য এলাকার মানুষও হাত লাগান ওই কাজে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গতকাল রাতেই জোয়ারের পানি বেড়ে যাওয়ায় ওই স্থানে মাটি দিয়ে কয়েক ফুট উচু করে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার দুপুরের জোয়ারে উচ্চতা বাড়ায় বাঁধ উপচে পানি ভেতরে প্রবেশ করার উপক্রম হয়েছে।

default-image

সরেজমিন দেখা গেছে, কাঠকাটা লঞ্চঘাট এলাকায় একটি বড় বাঁক নিয়েছে প্রমত্তা শাকবাড়িয়া নদী। নদীর ওপর পাড়েই সুন্দরবন। রাতে ওই স্থানে একত্র হয়ে কাজ করেছিলেন এলাকাবাসী। তখন মাটি দিয়ে বাঁধ উঁচু করেছিলেন। জোয়ারের পানি কমে যাওয়ার পর গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছিলেন তাঁরা। গ্রাম পুলিশের আহ্বানে আবার হাত লাগিয়েছেন বাঁধের কাজে। তাঁরা জানেন, ওই কাজের জন্য তাঁদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না। তবু কোনোভাবেই যেন পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্যই তাঁদের সম্মিলিত লড়াই।

বাঁধ রক্ষার ওই কাজে শামিল হয়েছিলেন মো. আকসেদুর রহমান। প্রায় ৫০ বছর বয়স্ক ওই ব্যক্তির কাঠকাটা বাজারে মুদির দোকান রয়েছে। তাঁর বাড়ি অন্য এলাকায়। এ কথাও তিনি জানেন, ওই স্থান দিয়ে জোয়ারের পানি গেলেও তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না। তারপরও মাথায় মাটির বস্তা নিয়ে সবার সঙ্গে কাজ করছিলেন তিনি। আকসেদুর রহমান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এভাবেই সবার বিপদে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কে লাভবান হবেন আর কার ক্ষতি হবে, সেটি বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো, পানি যেন কোনোভাবেই লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে।’

default-image

মাটির বস্তা নিয়ে কাজ করতে হাঁপিয়ে উঠছিলেন স্থানীয় জনক মণ্ডল। তিনি বলেন, বাঁধ রক্ষায় সরকার এগিয়ে না এলেও সাধারণ লোকজন ঘরে বসে থাকেন না। কোথাও বাঁধের সমস্যা হলে সবাই এগিয়ে আসেন, সম্মিলিতভাবে কাজ করেন। আম্পানের সময় কয়রার প্রায় ১৫টি স্থানের বাঁধ ভেঙে যায়, সবার সম্মিলিত চেষ্টাতেই তা মেরামত করা সম্ভব হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, বাঁধ রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ১০০ প্লাস্টিকের বস্তা দেওয়া হয়েছে। ওই বস্তা দিয়েই তাঁরা কাজ করছেন। কতক্ষণ বাঁধ টিকিয়ে রাখা যাবে, তা তাঁরা জানেন না। একবার নোনা পানি ঢুকলে এলাকার সব নষ্ট হয়ে যাবে।

আম্পানের সময় ওই ইউনিয়নের কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। সাগরের নোনা পানিতে তলিয়ে থাকে ১০টির বেশি গ্রাম। আট মাস পর পানিমুক্ত হয় গ্রামটি। ওই ক্ষত এখনো শুকায়নি। কাজ করতে করতে গিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেন তাঁরা। তাঁরা বলেন, নদীর বড় বাঁক থাকায় বড় কোনো ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলেই ওই এলাকার বাঁধের ক্ষতি হয়। কিন্তু স্থায়ীভাবে বাঁধ মেরামতে কোনো কাজই করা হয় না। জনপ্রতিনিধিরা বারবার আশ্বাস দেন কাজ করার, কিন্তু ঝড় চলে গেলে আবার আগের মতোই হয়ে যায়।

কয়েকটি স্থানে ভেঙেছে বাঁধ

রাত ও দুপুরে একজোট হয়ে কাজ করেও পানি আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গাতির ঘেরি ও দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের আংটিহারা এলাকায় বাঁধ ভেঙে গেছে।

আংটিহারা এলাকার মো. আবু সাইদ বলেন, মঙ্গলবার রাত ও আজ বুধবার দুপুরে স্বাধীন সমাজকল্যাণ যুব সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দুপুরের দিকে আংটিহারা এলাকার শ্রীপদ মণ্ডলের বাড়ির সামনের প্রায় ২০০ ফুট শাকবাড়িয়া নদীর বাঁধ জোয়ারের পানিতে ভেঙে যায়। এতে ওই ইউনিয়নের আংটিহারা, জোড়শিং, খাসিটানাসহ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাতের জোয়ারে আরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেশ বিশ্বাস বলেন, অন্তত দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙে ও বাঁধ উপচে অন্তত ১০টি স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। সব জায়গাতেই স্বেচ্ছাসেবকেরা সক্রিয় রয়েছেন। জোয়ারের পানি সরে গেলে স্থানীয়দের সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের বাঁধ সংস্কারের চেষ্টা করা হবে। যেসব স্থানে বাঁধ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ওই সব স্থানের মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন