বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কারাম উৎসব বিষয়ে লেখক ও গবেষক উজ্জ্বল মাহাতো বলেন, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নানা প্রথা ও ধর্মীয় আচরণের মাধ্যমে কারাম উৎসব পালন করে থাকে। সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, বড়াইক, কুর্মি, সিং, পাহান, মাহালিসহ  বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ রীতিতে কারাম উৎসব পালন করে থাকে।
কারাম উৎসবের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে তিনি বলেন, কারাম নামের গাছের ডাল কেটে বিভিন্ন প্রাচীন প্রথা মান্য করে এ উৎসব করা হয়। তাই এর নাম কারাম উৎসব। গাছের ডাল মাটিতে পুঁতে পূজা করা হয়। তাই এটি কোথাও কোথাও ডালপূজা নামেও পরিচিত।

কারাম উৎসব বিষয়ে লেখক ও গবেষক উজ্জ্বল মাহাতো বলেন, এ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা পাঁচ দিনের। কোথাও কোথাও সাত দিন ধরে এই অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। প্রথম দিন থেকেই যাঁরা কারাম পূজায় অংশগ্রহণ করেন (কেরমেতি), তাঁদের আমিষ খাবার, হলুদ, তেল ও সব ধরনের মসলাজাতীয় খাদ্য পরিহার করতে হয়। কেরমেতি বলতে যাঁরা কারাম পূজায় অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের বোঝায়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, যদি এই খাবার পদ্ধতির কেউ অনিয়ম করেন, তাহলে তাঁর অংশের বীজের অঙ্কুরোদগম (জাঁওয়া) মরে যায়। জাঁওয়া বলতে বোঝায় মাটি, বালু, মুং, কুর্থি, ছোলা ইত্যাদি উপকরণের সমন্বয়ে চারা গাছের অঙ্কুরোদগমের যে ডালা তৈরি করা হয়। এটি বৃহৎ অর্থে বৃক্ষের তথা কৃষির বিভিন্ন বীজের অঙ্কুরোদগম, সন্তানস্নেহে লালন–পালন ও সংরক্ষণকেই বোঝায়।

কারাম উৎসবে মূলত বীজের অঙ্কুরোদগম, বীজ থেকে চারা তৈরি, সন্তানস্নেহে লালন-পালন ও সংরক্ষণ প্রতীকী অর্থে প্রকৃতিকেই বন্দনা করা হয়।

বিভিন্ন রকম আচার ও গীতের মাধ্যমে জাঁওয়া তোলা হয়। অর্থাৎ প্রকৃতির বন্দনা করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যায় বীজগুলো একসময় দুই পাতাবিশিষ্ট হলুদাভ সবুজ চারাগাছে পরিণত হয়। শেষের দিন কেরমেতিরা সন্ধ্যায় বাড়ির আঙিনায় কারাম ডাল পুঁতে শাপলা ফুল, শসা, ফিতা প্রভৃতি দিয়ে সাজান। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে কারামগাছটির সংকট দেখা দিয়েছে। এই গাছটিকে যদি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা না হয়, তবে আমাদের ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়বে।’

default-image

উৎসবে অংশ নিতে আসা বগুড়া টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা মোহন মাহাতো বলেন, ‘বছরের এই দিনে সবার সঙ্গে আনন্দ করার জন্য গ্রামে ফিরে আসি।’

গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি কানাইলাল মাহাতো উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে গল্প শোনান। স্থানীয় নির্মল কুমার মাহাতো বলেন, এই দিনে এলাকার মানুষ পূজা আর আনন্দে মেতে ওঠেন।

মাহাতো ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাপলা রানী মাহাতো বলেন, কৃষি ও বৃক্ষের সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর আত্মার সম্পর্ক।

ইন্ডিজেনাস সোসাইটি অ্যান্ড কালচার বাংলাদেশের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠান আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করছে মাহাতো ফাউন্ডেশন।

গোবিন্দগঞ্জে উৎসব উদ্‌যাপন করল ওঁরাও সম্প্রদায়
আমাদের প্রতিনিধি, গাইবান্ধা জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বৃহস্পতিবার ওঁরাও সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব কারাম পূজা অনুষ্ঠিত হয়। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম দইহারা গ্রামে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে আসা ওঁরাও জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেয়। উৎসবে তাদের নিজেদের ভাষা, সাংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। কারাম উৎসব উদ্‌যাপন কমিটি ও গাইবান্ধার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অবলম্বন এ উৎসবের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কারাম উৎসব উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক সুরেন তিগ্যা। বক্তব্য দেন শাখাহার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাহাজুল ইসলাম, আদিবাসী নেতা গৌর চন্দ্র পাহাড়ী, মিলন তিগ্যা, জিসাই তিগ্যা, অবলম্বনের প্রকল্প কর্মকর্তা শাবানা আকতার, মাঠকর্মী মাজেদুল ইসলাম, সখী রানী পাহাড়ী, আবিনা টপ্য, সরলা মিনজি, লিটন তিগ্যা প্রমুখ।

কারাম উৎসব উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক সুরেন তিগ্যা বলেন, ‘কারাম একটি গাছের নাম। ওঁরাও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এটি একটি পবিত্র গাছ। মঙ্গলেরও প্রতীক। প্রতিবছর বংশপরম্পরায় পালন করা হয় এই পূজা। এ উৎসব ঘিরে প্রতিবছর মুখর হয় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ওঁরাও জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা। উৎসবে ওঁরাও সম্প্রদায়ের লোকজন উপবাস করে কারামগাছের ডাল কেটে আনেন। কারামের ডাল কেটে অস্থায়ী মণ্ডপে পুঁতে রেখে পূজা-অর্চনা আর নাচ-গান ও গল্প বলার মধ্য দিয়ে এই উৎসব শুরু হয়।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন