বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সুধা রানীর বয়স হয়েছে। এখন আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল তানোরের তালন্দ এলাকায়। এখন নগরের মুন্সীডাঙ্গা এলাকায় এক কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। ছেলে লক্ষ্মীকান্ত সরকারের আলাদা সংসার। তিনি অটোরিকশা চালান। দুই মেয়ের মধ্যে একজন সংসার করছেন। অন্যজন স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় মায়ের সঙ্গে থাকেন। সুধা বেতন পান তিন হাজার টাকা। বাসা ভাড়ায় যায় দুই হাজার টাকা। বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত গ্রন্থাগারে সময় দিতে হয়। অন্য সময় মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। কাজ না করলে কুকুর-বিড়ালসহ তাঁর নিজের সংসার চলে না।

সুধার বিড়ালগুলোর নাম মনো, ফুলটুসি, সোনা, সেন্টু ও মনা। তাঁর ভাষায়, মনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কখন আসে কখন যায়, ঠিক নেই। কুকুরগুলোর মধ্যে কালু আর গ্রন্থাগারের সামনে থাকে না। মুন্সীডাঙ্গায় সড়কের পাশে থাকে। সব কুকুরের খোঁজ তাঁর কাছে থাকে।

কালুকে খাওয়ানোর সময় আরও দু-চারটা কুকুর পাশে এসে বসে, কিন্তু তারা কালুর খাবারে ভাগ বসায় না। ওরা হয়তো এত দিনে বুঝে গেছে, এ খাবার শুধু কালুর। যাওয়ার সময় সুধা অন্য কুকুরগুলোকে কয়েক টুকরা রুটি দিয়ে যান।
default-image

বাসা থেকে খাবারের ব্যাগ আর একটি ছোট লাঠি নিয়ে বের হন সুধা। প্রথমেই কালুকে খাবার দেন। ডাক দিতেই কোত্থেকে ছুটে এল কালু। ২০ সেপ্টেম্বর সকালে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেল। তবে অন্য কুকুর কামড়ে কালুর কানের কাছে ঘা করে দিয়েছে। এদিন কালু এল ঠিকই, কিন্তু খেতে চাচ্ছিল না। সুধার আফসোসের শেষ নেই, কেন ওষুধটা আনলেন না! আদর পেয়ে কালু একবার খাবারে মুখ দিল। তারপর দূরে গিয়ে পা সটান করে শুয়ে পড়ল। সুধা বললেন, কালু আজ আর খাবে না।

কালুকে খাওয়ানোর সময় আরও দু-চারটা কুকুর পাশে এসে বসে, কিন্তু তারা কালুর খাবারে ভাগ বসায় না। ওরা হয়তো এত দিনে বুঝে গেছে, এ খাবার শুধু কালুর। যাওয়ার সময় সুধা অন্য কুকুরগুলোকে কয়েক টুকরা রুটি দিয়ে যান। এরপর চলে যান মিঞাপাড়ায়। সেখানে কালুর মা কালি থাকে। কালির সঙ্গে ঘোড়ামারার একটি, দরগাপাড়ার একটিসহ আরও পাঁচ-ছয়টি কুকুর থাকে। সেখানে গিয়েও একই আদর শুরু করলেন। আবার সেই কথা। ‘খাও সোনা, খাও খাও...।’ এ সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন অন্নপূর্ণা নামের ষাটোর্ধ্ব এক নারী। তিনি বলেন, ৩০ বছর ধরে সকালবেলায় এই একই কথা শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গেছে। ‘আজ খাও সোনা। কাল মাছ আনব, মাংস আনব...।’

মানুষকে অনেক করেছি। তারা মনে রাখে না। কিন্তু এরা আমাকে ভুলে যায় না।
সুধা রানী

প্রাতর্ভ্রমণের সময় প্রতিদিন ব্যাংক কর্মকর্তা সোয়াইবর রহমান কুকুরকে খাওয়ানোর এই দৃশ্য দেখেন। তিনি সেদিন সুধার কাছে জানতে চাইলেন, কুকুর-বিড়াল নিয়ে কেন থাকেন। সুধা উত্তরে বললেন, ‘মানুষকে অনেক করেছি। তারা মনে রাখে না। কিন্তু এরা আমাকে ভুলে যায় না।’ মিঞাপাড়ায় খাবার দিয়ে মুন্সীডাঙ্গায় আসার সময় একদল কুকুর সুধাকে ঘিরে ধরল। তিনি সব কুকুরের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।

কালো রঙের একটি কুকুর এসে সুধার একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সুধা বলতে থাকলেন, ‘তোর কী হয়েছে? এখানে দৌড়াদৌড়ি করছিস কেন?’ এ সময় আরও কয়েকটি কুকুর এগিয়ে এল। কুকুরগুলো উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কাজে যাওয়ার সময় বিস্কুট দিয়ে যাব, এখন যা।’ এই কথা শুনে কুকুরগুলো একে একে চলে গেল।

প্রতিদিন দুপুরে লাইব্রেরিতে যাওয়ার সময় কুকুরগুলোকে বিস্কুট দিয়ে যান সুধা রানী। দুপুরে বাড্ডু আর কালি নামের আরও দুটি কুকুর বাসায় এসে খেয়ে যায়। তাঁর বাসায় গিয়ে দেখা গেল, বাডডু আর কালির ভাতের থালা পড়ে আছে। বিড়ালগুলো বিছানায় আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সুধার মেয়ে পাতু বললেন, ওরা খেয়ে ঘুমিয়েছে। ওদের ঘুম ভাঙানো যাবে না। খুব বিরক্ত হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন