কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নাম জমি জালিয়াত চক্রে

বিজ্ঞাপন
default-image

এম এম এ ওয়াদুদের (৬১) পরিবারটি কুষ্টিয়া শহরের পুরোনো ধনাঢ্য পরিবার হিসেবে পরিচিতি। অর্ধশতক আগে কুষ্টিয়া শহরের সবচেয়ে বড় ওষুধের ব্যবসা ছিল তাঁদের। বাবা এম এম এ হাকিম মারা যাওয়ার পর শহরের প্রাণকেন্দ্রের তিনটি জায়গায় সাড়ে চার বিঘা জমির মালিক হন ওয়াদুদ, তাঁর মা এবং চার বোন। ওই জমির বাজারদর প্রায় শতকোটি টাকা।

নির্বিবাদী হিসেবে পরিচিত পরিবারটির সেই জমির ওপর নজর পড়ে প্রভাবশালী একটি চক্রের। চক্রটি এম এম এ ওয়াদুদ, তাঁর মা–সহ পরিবারের ছয় সদস্যের নামে জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে ২২ শতক আয়তনের ১০ কোটি টাকার জমিটি বেচার প্রক্রিয়া শুরু করে। ঘটনা জেনে মামলা করেন ওয়াদুদ। সেই মামলায় পুলিশ এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহর যুবলীগের সদ্য সাবেক আহ্বায়ক আশরাফুজ্জামান সুজনসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল সোমবার ওই মামলার আসামি শহরের বড়বাজার এলাকায় হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মহিবুল ইসলাম আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি রবিউল ইসলামের সম্পৃক্ততাও উঠে এসেছে। এমন জালিয়াত চক্রে শহরের প্রথিতযশা একজন রাজনীতিকের যুক্ত থাকার তথ্যে বিব্রত স্থানীয় রাজনীতিক, এমনকি তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে হাজি রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আমার কাছে ভৌতিক মনে হচ্ছে। এই ছেলেকে (মহিবুল) আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনিও না এবং কোনো দিন দেখিওনি। জমিজমার বিষয়টি আমি কিছুই জানি না। এর পেছনে বড় ধরনের একটা যড়যন্ত্র কাজ করছে। হয়তো আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কালিমালেপনের জন্য কেউ না কেউ এটা করছে।’

আর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুষ্টিয়া মডেল থানার পরিদর্শক আকিবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মহিবুল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। অনেকের নামই এসেছে। বিষয়টি যাছাই–বাছাই করে প্রত্যেককে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে কাজ করছে পুলিশ। তিনি জানান, গতকাল যুবলীগ নেতা আশরাফুজ্জামানের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

এম এম এ ওয়াদুদের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, জালিয়াত চক্রটি প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের ২২ শতক জমির ভুয়া মালিক সেজে মাত্র ৭৭ লাখ টাকায় হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মহিবুল ইসলামের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৭ সেপ্টেম্বর করা ওই মামলায় ১৮ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন যুবলীগ নেতা আশরাফুজ্জামান, ব্যবসায়ী মহিবুল ইসলাম (৩৯), চাকরিজীবী মহিবুল ইসলাম (৩১), মিন্টু খন্দকার, মিলন মেম্বার, মিলনের বোন জাহানারা ও সানোয়ারা। এই চক্রটির মধ্যে মিন্টু খন্দকার এম এম এ ওয়াদুদের নামে পরিচয়পত্র বানিয়ে তাঁর পরিচয়ে মালিক সেজে জমি বেচে দেন। মিলন মেম্বারের দুই বোন পরিবারের নারী আত্মীয় হিসেবে দলিলে স্বাক্ষর করেন।

জমির মালিক এম এম এ ওয়াদুদ হাজি রবিউলের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এটা একটা বিশাল বড় চক্র। এ চক্রের মধ্যে তিনিও (হাজি রবিউল) থাকতে পারেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জড়িত না থাকলে এত বড় জালিয়াতি করতে পারার কথা নয়।’

এ মামলার বিষয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, ‘যেহেতু এ মামলাটির সঙ্গে এনআইডি জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি জড়িত। এ ঘটনায় যাঁরা জড়িত থাকবেন, তাঁদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে, এটা আমার দৃঢপ্রত্যয়। মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মহিবুলের জবানিতে

ব্যবসায়ী মহিবুল জবানবন্দিতে বলেন, ২০১৭ সালের শেষের দিকে হালিম উদ্দীন, মজমপুরের বাবু মেম্বর, লাহিনী বটতলার রাজু আহমেদ, জাহিদুল ইসলাম মিলে কুষ্টিয়ার পৌরসভার ভেতরে পুকুরপাড়ে তাঁকে জমি বিক্রির প্রস্তাব দেন। ওই স্থানে তৃতীয় বৈঠকে যুবলীগ নেতা আশরাফুজ্জামান ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি রবিউল ইসলাম যোগ হন। সেই বৈঠকে জমির দাম ৭৭ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারিত হয় (জমির বাজারদর ১০ কোটি টাকা প্রায়)। এর বাইরে আরও ৩০ লাখ টাকা হাজি রবিউল ইসলামকে দিতে হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। কথা ছিল, কোনো সমস্যা হলে হাজি রবিউল সামাল দেবেন।

জবানবন্দিতে বলা হয়, চতর্থ বৈঠকে জানানো হয় মহিবুলের লগ্নি করা ৭৭ লাখ ২০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এর বাইরে জমি বেচে এক কোটি টাকা লাভ দেওয়া হবে। জমির লাভের অবশিষ্ট টাকা সবাই ভাগাভাগি করে নেবেন। এরপর জমি রেজিস্ট্রির দিন মালিকপক্ষ হয়ে জাহিদ ও বাবু তাঁর (ব্যবসায়ী মহিবুলের) কাছ থেকে নগদ ৭৭ লাখ ২০ হাজার টাকা নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩০ লাখ টাকা হাজি রবিউল ইসলামকে দেওয়া হয়। এরপর ওই মামলার বাদী খারিজের বিপক্ষে আবেদন দিলে জমি আর নাম খারিজ হয়নি।

জালিয়াত চক্রে রাজনৈতিক সহযোগী হাজি রবিউলের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গতকাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। তাঁর (হাজি রবিউল) মতো লোক এ রকম ঘটনায় জড়াবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন