বিজ্ঞাপন

ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য কৃষকের তালিকা তৈরির পর তা বিতরণ করে ইউনিয়ন কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি। ওই কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট ইউপির চেয়ারম্যান। সদস্যসচিব সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। আর ইউপি সদস্যরা কমিটির সদস্য। কমিটির সদস্য হওয়ায় কৃষক হলেও নৈতিকভাবে এই প্রণোদনা নেওয়া যায় না।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে খরিফ-২ মৌসুমে (চৈত্র থেকে ভাদ্র) রোপা আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ঠাকুরগাঁও জেলায় ৯ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বিনা মূল্যে হাইব্রিড ও উফশী জাতের ধানবীজ-সার সহায়তা কর্মসূচি নেয় সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত একটি কৃষক পরিবারের জন্য রোপা আমন হাইব্রিড ধানের ক্ষেত্রে ২ কেজি বীজ, ২০ কেজি ডিএপি, ১০ কেজি এমওপি সার অথবা প্রতি বিঘা রোপা আমন উফশী চাষের জন্য ৫ কেজি বীজ, ১০ কেজি ডিএপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়। উপজেলায় তিন হাজার ৩৮০ জনকে এই প্রণোদনা দেওয়া হয়।

রুহিয়া-১ ইউনিয়নের কৃষি প্রণোদনা উত্তোলনের তালিকা খতিয়ে দেখা গেছে, তালিকায় ৫৯ জন কৃষকের নামের পাশে ১০ জন ইউপি সদস্যের মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মারুফ হোসেনের দাবি, কৃষকদের নিজস্ব মুঠোফোন নম্বর না থাকায় পরিচিতদের নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে।

কিন্তু তালিকায় দেখা যায়, ৩ নম্বর সংরক্ষিত নারী আসনের ইউপি সদস্য বীণা রানীর বাড়ি রুহিয়া ইউনিয়নের মধুপুর এলাকায়। কিন্তু পাঁচ কিলোমিটার দূরের অন্য সংরক্ষিত আসনের এলাকা কুজিশহরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের নামের পাশে বীণা রানীর মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়েছে। রফিকুল ইসলাম জানালেন, তাঁর নিজের মুঠোফোন আছে। তেমনিভাবে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইউসুব আলীর বাড়ি মধুপুর এলাকায় হলেও কুজিশহর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলামের নামের সামনে তাঁর মুঠোফোন নম্বর দেওয়া।

ফণীভূষণ পেশায় রিকশাভ্যানচালক। বসতবাড়ির এক টুকরো জমি ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই তাঁর। কিন্তু প্রণোদনার ধানের বীজ ও রাসায়নিক সার উত্তোলন তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। তবে ফণীভূষণ বলেছেন, তিনি কোনো প্রণোদনা পাননি।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া-১, রুহিয়া পশ্চিম, রাজাগাঁও ও ঢোলারহাট ইউনিয়নে সরেজমিনে কথা হয় কয়েকজন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সঙ্গে। তাঁরা অভিযোগ করেন, কৃষি প্রণোদনার তালিকায় তাঁদের নাম ঢোকানো হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাঁদের নামের পাশে জনপ্রতিনিধিদের মুঠোফোন নম্বর দেওয়া। তাঁরা প্রণোদনাও পাননি।

রুহিয়া-১ ইউনিয়নের ঘনিমহেশপুর গ্রামের কৃষক ইন্তাজুল ইসলামের ২৫ থেকে ৩০ বিঘা আবাদি জমি আছে। প্রকল্পের শর্তানুযায়ী, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের প্রণোদনার তালিকায় তাঁর নাম থাকার কথা নয়। গত শুক্রবার তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, ‘কই? আমি তো ধানের বীজ, সার পাইনি!’

ঘনিমহেশপুর গ্রামের রাস্তার পাশে জটলা ধরে বসে ছিলেন জনা কয়েক মানুষ। সে সময় তাঁদের কৃষি প্রণোদনা উত্তোলন তালিকার নামগুলো পড়ে শোনালে তাঁরা নরেশ দাস, সলেমান আলী, বিপ্লব দাশ, মোহাম্মদ বিপ্লবের বাড়ি দেখিয়ে দেন। বাড়ি গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা কেউ প্রণোদনার সার–বীজ পাননি।

রুহিয়া-১ ইউনিয়নে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, ইউনিয়ন কৃষি পুনর্বাসন কমিটির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান এবং সদস্যসচিব উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। কৃষক তালিকা করার সময় কৃষি কর্মকর্তাদের কথা খুব একটা গুরুত্ব পায় না।

ওই ইউপির চেয়ারম্যান মনিরুল হক বলেন, ‘সম্প্রতি আমি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। এ সময়ে কৃষি প্রণোদনার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আমার অনুপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটেছে। পরে জানতে পেরে তা সংশোধন করার চেষ্টা করেছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, কৃষি প্রণোদনা বিতরণে এর আগে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন