বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নোমানের খালাতো ভাই হযরত আলী পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী। নোমানকে শহরে নিয়ে আসার পর তাঁর ভালোমন্দ—সবকিছুই তিনি দেখতেন। ঈদে দুজন একসঙ্গে বাড়ি ফিরতেন। ৮ জুলাইয়ের আগেও হাসেম ফুডসের কারখানাটিতে আগুন লেগেছিল। জুন মাসের শেষ সপ্তাহের আগুনে নোমানের পা পুড়েছিল। সে খবর হযরত আলীকে জানিয়েছিলেন নোমান। ভাইয়ের কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন, পা পুড়লেও কারখানা থেকে ছুটি দিচ্ছে না। বাড়ি ফিরতে চান তিনি। নোমানের ইচ্ছে ছিল, কোরবানির ঈদের কয়েক দিন আগেই ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যাবেন। লম্বা সময় মায়ের কাছে থাকবেন। বাবা–মাকে দেওয়া কথা রাখবেন।

সে কথা মনে করেই কাঁদেন হযরত আলী। নিজের সবচেয়ে বিপদের মুহূর্তেও হযরত আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন নোমান। ৮ জুলাই বিকেলে আগুন লাগার পর নোমান মুঠোফোনে হযরত আলীকে জানিয়েছিলেন, তাঁদের কারখানায় আগুন লেগেছে। চারতলার একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে তাঁরা কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছেন। ছাদে যেতে চাচ্ছেন তিনি। কিন্তু তাঁদের বড় স্যার কাউকেই ছাদে যেতে দিচ্ছেন না। তারপর রাত সাতটা পর্যন্ত নোমানের মুঠোফোন বেজেছে, কিন্তু ওই প্রান্ত থেকে কেউ আর ফোন তোলেননি।

পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে গতকাল মঙ্গলবার বাড়ি ফিরেছেন হযরত আলী। সে কথা গোপন থাকেননি ফিরোজার কাছে। রাত ১১টায় হযরত আলী বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে এসেছেন ফিরোজা। জানতে চেয়েছেন নোমান কোথায়। হযরত আলী এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি কী জবাব দেব, উনি তো পাগলের মতো কান্না করতেছিলেন। শেষে মিথ্যা বলছি। বলছি, এই ঈদেও নোমানের ছুটি হয়নি। ঈদের পর বাড়ি আসবে নোমান। উনি তখন গড়াগড়ি করে কাঁদছেন। এই কান্না আর থামে না। নোমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চাইছেন। বলছি নোমানের ফোন নষ্ট, কারখানায় কড়াকড়ি। কথা বলারও সময় হয় না। খালার (ফিরোজা) হাতে কিছু টাকা দিয়া বলছি, নোমান পাঠাইছে। তারপর আর ওনার মুখোমুখি হইনাই। এক মায়ের কাছে তাঁর সন্তান নিখোঁজের খবর কতক্ষণ লুকানো যায়?’ মুঠোফোনের ওপার থেকে বলতে বলতে কাঁদছিলেন হযরত আলীও।

ফিরোজা বেগম অপেক্ষায় আছেন, ঈদের পর ছেলে তাঁর বাড়ি ফিরবেন। কান্না থামবে তাঁর। হযরত আলী জানেন, চারতলার যে কক্ষে নোমান আটকে ছিল, সে কক্ষ থেকেই ৪৯টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। নোমানকে জীবিত খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। নোমানের বাবা মান্নান মাতব্বর বিধিনিষেধের মধ্যেই ধারদেনা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে এসেছিলেন। ছেলের পোড়া লাশটুকু খুঁজে পাওয়ার আশায় ডিএনএ দিয়েছেন। এসবের কিছুই জানেন না ফিরোজা। ফিরোজা কেবল কাঁদছেন ছেলেকে দেখার আশায়।

সেদিনের আগুনে যদি নোমানও পুড়ে থাকে, তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তাঁর দেহও বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। কয়লা হয়ে যাওয়া সে দেহ দেখে ফিরোজা বেগমের অপেক্ষা ফুরাবে কি?

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন