default-image

উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যানরা। কিন্তু করোনার ত্রাণ বিতরণ, দুস্থদের শীতবস্ত্র বিতরণ, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর দেওয়ার মতো কাজগুলো করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। পরিপত্রের মাধ্যমে পৃথক কমিটি করে ইউএনওদের এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার এলাকায় কে দরিদ্র, কে গৃহহীন এগুলো তো আমার জানার কথা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আমি। কিন্তু যখনই কোনো কাজের সময় আসে, তখনই ইউএনওকে প্রধান করে নতুন কমিটি করা হয়। আমরা জানিও না কাকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। কমিটির কাগজপত্রও দেখানো হয় না।’

উপজেলা পরিষদ আইনে সরকারের ১৭টি বিভাগকে স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পরিপত্রের মাধ্যমে ১৪০টি কমিটি তৈরি করে এগুলোর সভাপতি ও আহ্বায়ক করেছে ইউএনওদের। অথচ আইন অনুযায়ী এই দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একাধিক পরিপত্র জারি করে বিভাগের কার্যক্রমগুলো চেয়ারম্যানের অনুমোদন নিয়ে চালাতে নির্দেশ দিয়েছে। তবে পরিপত্র জারি করলেও নিজেদের নির্দেশনা নিজেরাই মানছে না স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। উপজেলা পর্যায়ে কার্যাবলি নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ১৫টি কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির সভাপতি বা আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন ইউএনও। আর উপজেলা চেয়ারম্যানদের করা হয়েছে কমিটির উপদেষ্টা। কার্যত কমিটিতে চেয়ারম্যানদের কোনো ভূমিকা থাকে না।

উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের নিয়ে গঠিত সংগঠন বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, চেয়ারম্যানের অনুমোদন ছাড়াই সব কাজ কমিটি প্রধানের ক্ষমতাবলে ইউএনও নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইউএনও পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও মূলত তাঁরাই আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।

চেয়ারম্যানের অনুমোদন ছাড়াই সব কাজ কমিটি প্রধানের ক্ষমতাবলে ইউএনও নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইউএনও পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও মূলত তাঁরাই আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।

উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করলেও নিজেরাই তা মানে না। উপজেলার একজন গরিব কৃষক, একজন গৃহহীন মানুষ, একজন দুস্থ মহিলা বাছাইয়ের কাজটিও ইউএনওদের দিয়ে করা হয়।

আইনে কী আছে

১৯৮২ সালে দেশে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৮৫ সালে। কিন্তু ১৯৯১ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার উপজেলা পরিষদ পদ্ধতি বাতিল করে। এর পর ২০০৮ সালে আবার অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ পদ্ধতি পুনরায় চালু করে ওই সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

আইনে উপজেলাকে প্রশাসনিক একাংশ ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া সরকারের ১৭টি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠপর্যায়ে তাঁদের কার্যাবলিসহ উপজেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরিত বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন, মহিলা অধিদপ্তর, মৎস্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রাথমিক শিক্ষা, কৃষি সম্প্রসারণ এবং বন অধিদপ্তর।

২০১০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ উপজেলা পরিষদের (কার্যক্রম বাস্তবায়ন) বিধিমালা সংশোধন করে। তাতে বলা হয়, উপজেলা পর্যায়ে হস্তান্তরিত সরকারি দপ্তরগুলোর কর্মকর্তারা কাগজপত্র, নথি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে অনুমোদনের জন্য পেশ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। এ অবস্থায় ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে কাগজপত্র ও নথি উপজেলা চেয়ারম্যানদের কাছে পেশ করার জন্য আবার নির্দেশনা দেয়।

বিজ্ঞাপন

কমিটির দায়িত্বে ইউএনওরা

উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের করা তালিকা অনুযায়ী, ১৭টি বিভাগের কার্যাবলি নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা পর্যায়ে ১৪০টি কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির সভাপতি বা আহ্বায়ক থাকেন ইউএনওরা। এর বাইরে হাতে গোনা কয়েকটি কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যানরা। আর ১৭টি বিভাগের অধীন একটি করে স্থায়ী কমিটি রয়েছে, যার সভাপতি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানরা। এই স্থায়ী কমিটিগুলোও কার্যকর করা হচ্ছে না বলে অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ।

তিনটি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা শুধু চেয়ারম্যান এই পরিচয়টুকুই দিতে পারেন, কাজ করতে পারেন না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিষদের অধীনে হস্তান্তর করা হলেও কার্যত সেখানে চেয়ারম্যানদের কোনো ভূমিকা থাকে না। নামসর্বস্ব কয়েকটি কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চেয়ারম্যানদের। আর অধিকাংশ কমিটির সভাপতি হিসেবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন ইউএনওরা।

উদাহরণ দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানরা বলেন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচির অধীন উপকারভোগী বাছাই, ভিজিডি খাদ্য ও কার্ড বিতরণের কাজটিও পরিপত্র জারি করে ইউএনওর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ইমদাদুল হক বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইউএনওরা কিছুদিনের জন্য আসেন, নিজেদের খেয়ালখুশিমতো সব পরিচালনা করেন। চেয়ারম্যানরা ক্ষমতাহীন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দুস্থ নারীরা আসেন নাম তুলতে। কিন্তু আমরা তো নিরুপায়।’

তবে একাধিক ইউএনও বলেন, যেসব দায়িত্ব উপজেলা চেয়ারম্যানদের দেওয়া আছে, সেখানে তাঁদের তদারকি কম। নিয়োগসহ যেসব কাজে আর্থিক বিষয় যুক্ত, সেখানে দায়িত্ব পালনে বেশি আগ্রহী তাঁরা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার যে দায়িত্ব দেয়, সেটি পালন করেন ইউএনওরা।

‘ইউএনওরা কিছুদিনের জন্য আসেন, নিজেদের খেয়ালখুশিমতো সব পরিচালনা করেন। চেয়ারম্যানরা ক্ষমতাহীন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দুস্থ নারীরা আসেন নাম তুলতে। কিন্তু আমরা তো নিরুপায়।’
ইমদাদুল হক বিশ্বাস , রাজবাড়ী সদর উপজেলার চেয়ারম্যান

উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যেসব কমিটি রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গ্রাম আদালত ব্যবস্থাপনা কমিটি, নদী রক্ষা কমিটি, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটি, হাটবাজার দরপত্র মূল্যায়ন ও ইজারা কমিটি, হাটবাজার খাস আদায় কমিটি, জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপি) কমিটি, মানবিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন কমিটি। প্রতিটি কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন ইউএনওরা।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ইউএনওরা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি। সে জন্য সরকারের দেওয়া বরাদ্দসংক্রান্ত কমিটিগুলোর প্রধান ইউএনওদের করা হচ্ছে। আর স্থানীয় পর্যায়ের আয়-ব্যয় সংশ্লিষ্ট কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যানরা। হস্তান্তরিত দপ্তরগুলোর নথিপত্র উপজেলা চেয়ারম্যানদের অনুমোদনের জন্য ইউএনওদের নির্দেশনা দেওয়া আছে।

তবে স্থানীয় সরকার সচিবের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার। তিনি বলেন, আইনে বিভাগগুলোর সব কার্যক্রমকে উপজেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার তহবিল বলে আলাদা কিছু নেই। তিনি বলেন, ইউএনওরা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হতে পারেন না। নির্বাচিত উপজেলা পরিষদই সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবে।

ইউএনওরা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি। সে জন্য সরকারের দেওয়া বরাদ্দসংক্রান্ত কমিটিগুলোর প্রধান ইউএনওদের করা হচ্ছে। আর স্থানীয় পর্যায়ের আয়-ব্যয় সংশ্লিষ্ট কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যানরা।
হেলালুদ্দীন আহমদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব

পরিপত্র জারির মাধ্যমে হস্তান্তরিত ১৭টি বিভাগের কার্যক্রম উপজেলা পরিষদের পরিবর্তে ইউএনওদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন উপজেলা চেয়ারম্যানরা। এই পরিপত্রগুলো সংশোধন তাঁদের মূল দাবি। ইতিমধ্যে বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে কর্মকর্তারা কাজ করবেন—এটিই সাংবিধানিক নিয়ম বলে জানান সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, বাস্তবে সংবিধান পরিপন্থীভাবে স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম চলছে। উপজেলা চেয়ারম্যানরা কার্যত ক্ষমতাহীন। নামকাওয়াস্তে বিভাগগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর উপজেলা চেয়ারম্যানদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার কথা, তা এখন পর্যন্ত হয়নি এবং হবে বলেও মনে হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে উপজেলা পরিষদ কখনো কার্যকর রূপ পাবে না।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন