default-image

যশোরের প্রাণ ভৈরব নদ খননকাজ চলছে। তবে খননের মাটি নদের তীরে না ফেলে নদের গর্ভেই ফেলা হচ্ছে। যে কারণে কোথাও কোথাও ভৈরব নদ পাশাপাশি দুটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। নদের শহরের অংশে দুই তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করেই চলছে খননকাজ। এতে নদ আরও ছোট হয়ে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় ৯৬ কিলোমিটার নদ পুনঃখনন কাজ চলছে। এর মধ্যে ৬৬ কিলোমিটারে খননকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে বলে ঠিকাদারেরা টাকা তুলে নিয়েছেন। কিন্তু খননের মাটি নদের ভেতরেই; যে কারণে প্রকল্পের সফলতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।

সম্প্রতি যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর গ্রামের কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের পাশে সেতুর কাছে গিয়ে দেখা গেছে, ভৈরব নদ যেন দুটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। খননের সময় মাটি কেটে তীরে না ফেলে নদের ভেতরেই ফেলা হয়। এতে নদ দুই ভাগ হয়ে দুটো সরু খালের সৃষ্টি হয়েছে। নদের সীমানাও চিহ্নিত করা হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা দুই খালের মাঝের জায়গায় পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ রোপণ করেছেন। যে কারণে নতুন করে নদের জায়গা অবৈধ দখলে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
৬৬ কিলোমিটারে খননকাজের টাকা ঠিকাদারেরা তুলে নিয়েছেন। মাটি নদের ভেতরে ফেলায় প্রকল্পের সফলতা নিয়ে শঙ্কা

শহরের বাবলাতলা সেতু থেকে নীলগঞ্জ সেতু পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদের খননকাজ চলছে। এই অংশে দুই পারে নদের জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়েছেন অনেকে। কিন্তু নদের তীরের অধিকাংশ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করেই খননকাজ চালানো হচ্ছে। ফলে নদ আরও ছোট হয়ে গেছে। গোপালগঞ্জের মেসার্স এসএস অ্যান্ড এমটি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খননকাজ করছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের নকশা অনুযায়ী খননকাজ চলছে। নদের মাটি আপাতত নদের সীমানার মধ্যেই ফেলা হচ্ছে। পরে তা সরিয়ে নেওয়া হবে। কাজ শেষ হলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে।’

নদের মাটি আপাতত নদের সীমানার মধ্যেই ফেলা হচ্ছে। পরে তা সরিয়ে নেওয়া হবে। কাজ শেষ হলে পরিষ্কার বোঝা যাবে।
মনিরুজ্জামান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী

গত বুধবার শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা সেতু ও কাঠেরপুল সেতুর পাশে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুর পূর্ব পাশে নদের ৮০০ মিটার অংশে খননকাজ চলছে। দুটি খননযন্ত্র দিয়ে খননকাজ চালানো হচ্ছে। এই অংশে নদের দুই তীরে অন্তত সাতটি বহুতল ভবন রয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ৩০টি স্থাপনার আংশিক অংশ ও সীমানাপ্রাচীর নদের জায়গার মধ্যেই রয়েছে, যা উচ্ছেদ করা হয়নি। দড়াটানা সেতুর পশ্চিমাংশের ৮৪টি স্থাপনা উচ্ছেদ করায় নদের প্রস্থ ২২০ থেকে ২৫০ ফুট। কিন্তু পূর্বাংশে প্রস্থ ১৭০ থেকে ১৯০ ফুট। কারণ, এই অংশে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি। এই অংশে নদের প্রস্থ কম হওয়ায় খননকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে খননের মাটি আবার নদের ভেতরেই ফেলা হচ্ছে।

ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ভৈরব নদ খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘পানি আইনের’ নদীতট সংরক্ষণের বিষয়টি মানা হয়নি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা পানি আইন বাস্তবায়নে একেবারেই উদাসীন। তাঁদের নদী খননের নকশায় নদীতটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। ফলে ভৈরব ও কপোতাক্ষ নদের মতো বড় বড় নদ খননের সময় নদের মধ্যে একাধিক খালের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে নদ-নদী মরে যাওয়া শঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এ নদীতট (ফোরশোর) সম্পর্কে বলা হয়েছে, বছরের যেকোনো সময় ভরা কটালে নদীর সর্বনিম্ন পানি স্তর থেকে সর্বোচ্চ পানি স্তরের মধ্যবর্তী অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা হচ্ছে নদীতট। ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০ অনুযায়ী, নদীর দুই ধারের যে অংশ শুষ্ক মৌসুমে চর পড়ে এবং বর্ষা মৌসুমে ডুবে যায়, তা নদীতট (ফোরশোর) নামে অভিহিত। এই নদীতট এলাকায় কোনো ব্যক্তির অধিকার থাকে না। কেউ এই জমি দখল করলে তিনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হবেন। উচ্চ আদালতের এক রায়ে নদী দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রায়ে সব নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা এবং নদ-নদী সুরক্ষায় নদী রক্ষা কমিশনকে এর আইনগত অভিভাবক ঘোষণা দেওয়া হয়।

পাউবোর কর্মকর্তারা উদাসীন। নদী খননের নকশায় নদীতটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।
ইকবাল কবির জাহিদ, উপদেষ্টা, ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটি

এ বিষয়ে পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘খননের সময় মাটি নদের সীমানায় ফেলার চেষ্টা করা হয়। নদের প্রশস্ততা সব জায়গায় এক রকম নয়। কোথাও বেশি আবার কোথাও কম। তবে নদের একটা গড় অবস্থান ধরে খনন প্রকল্পের নকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পানি আইন মেনে ভৈরব নদ খনন করা যাচ্ছে না। আমরা জমির সিএস রেকর্ড ম্যাপ ধরে নদ খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। শহরাংশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ খনন প্রকল্প বায়স্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। আমি ওই কমিটির সদস্য। কিন্তু কমিটির কোনো সভা হয়নি।’ তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ের ৯৬ কিলোমিটারের নদের মধ্যে ৬৬ কিলোমিটার খননকাজ শেষ হয়েছে। শহরাংশের চার কিলোমিটার খননের কাজ চলছে। এ অংশের দুই তীরে পায়ে হাঁটা পথসহ সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য আরেকটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের নকশা তৈরির কাজ চলছে। এ ছাড়া দর্শনার সিংনগর বাঁওড় থেকে জীবন নগর পর্যন্ত ভৈরব নদের আরও ২০ কিলোমিটার খননকাজ শুরু হচ্ছে। মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরব নদের সংযোগ স্থাপন এবং নদের ওপর নির্মিত ছোট ছোট সেতু–কালভার্ট অপসারণের জন্য আরেকটি প্রকল্পের সমীক্ষা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন