খুলনায় সন্ধ্যার পর যেন বিধিনিষেধ উধাও, শনাক্ত বাড়ছে
রাত আটটা। বিকেল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির রেশ তখনো চলছে। বিভিন্ন দোকানের সামনে লোকজন দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। কেউ চা খাচ্ছেন, কেউবা ব্যস্ত কেনাকাটায়। অধিকাংশের মুখেই নেই মাস্ক। দৃশ্যটি গতকাল রোববার রাতে খুলনা নগরের মিয়াপাড়া মেইন রোড এলাকার। সন্ধ্যার পর থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একই রকম দৃশ্য চোখে পড়েছে। এ সময় মুদিদোকান থেকে শুরু করে বাজার, বেকারি, মাছ-মাংস, আসবাব ও প্রসাধনীর দোকান, এমনকি পর্দা-বিছানা ও চাদরের দোকানও খোলা থাকতে দেখা গেছে।
এটা শুধু পাড়ামহল্লাতেই নয়, শহরের খানজাহান আলী, শেরেবাংলা সড়কের মতো মূল সড়কের পাশের অনেক দোকান এভাবেই সন্ধ্যার পর খোলা থাকছে। প্রায় সব অলিগলিতে চার-পাঁচজন জড়ো হয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ও চোখে পড়েছে। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য এস এম ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিধিনিষেধের নামে যেন তামাশা চলছে। বিধিনিষেধ চলায় একশ্রেণির মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে করোনা প্রতিরোধে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। কোনোভাবেই স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। দিনের বেলা প্রচুর মানুষের আনাগোনা, আর সন্ধ্যার পরও পাড়ামহল্লায় ব্যাপক হারে আড্ডা জমছে। দোকানপাট খোলা থাকছে।
এক সপ্তাহের ওই বিধিনিষেধের আজ সোমবার ছিল চতুর্থ দিন। সড়কে যানবাহন চলাচল ও মানুষের আনাগোনা দেখে বোঝার উপায় নেই যে বিধিনিষেধ চলছে।
করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ৪ থেকে ১০ জুন ৭ দিন খুলনা সদর, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর থানা এলাকা ও রূপসা উপজেলায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিধিনিষেধে বলা হয়েছে, কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদিদোকান বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো কাঁচাবাজার ও মুদিদোকান খোলা রাখা যাবে না। সন্ধ্যার পর কোনো রাস্তার মোড়ে বা স্থানে একাধিক ব্যক্তির জটলা বা একসঙ্গে চলাফেরা করা যাবে না।
এদিকে এক সপ্তাহের ওই বিধিনিষেধের আজ সোমবার ছিল চতুর্থ দিন। সড়কে যানবাহন চলাচল ও মানুষের আনাগোনা দেখে বোঝার উপায় নেই যে বিধিনিষেধ চলছে। নগরের বড় বড় মার্কেটই কেবল বন্ধ রয়েছে। আর খোলা রয়েছে বিভিন্ন মহল্লার দোকান। সেন্ট জোসেফ স্কুলের পাশে টিসিবির পণ্যের ট্রাকের সামনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সাইকেলের টায়ার দেওয়া থাকলেও ক্রেতাদের গা–ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াতে দেখা গেছে। অনেককে মাস্ক ছাড়াই লাইনে দেখা গেছে।
এসব বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইউসুপ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুলনা নগরে আমাদের ছয়টি টিম এবং রূপসায় একটি টিম কাজ করছে। রূপসার ইউএনও, এসি ল্যান্ড তিন দিন দায়িত্ব পালনের পর দুজনেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। জেলা প্রশাসনের সাত ম্যাজিস্ট্রেটের ছয়জন সারা দিন বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালাচ্ছেন। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত তাঁরা মাঠে থাকছেন।’ তিনি বলেন, বিধিনিষেধ ঢিলেঢালা কথাটা ঠিক নয়। আর বিধিনিষেধে কার্যকরে জেলা প্রশাসন, মেট্রোপলিটন পুলিশ ও সিটি করপোরেশন—সবাই সম্পৃক্ত। শুধু একটা প্রতিষ্ঠানকে বলে লাভ নেই।
বাড়ছে সংক্রমণ, রোগীর চাপ
খুলনায় চলমান বিধিনিষেধের মধ্যেও থেমে নেই আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি। খুলনা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় কোভিড রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৫১। এর মধ্যে শহরেই শনাক্ত ৮ হাজার ৭৪০ জন। জেলায় করোনায় এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৮৪ জন। যার মধ্যে খুলনা নগরেই মারা গেছেন ১৪৪ জন। শেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনা জেলায় ৩০৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৭৯ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
১ থেকে ৭ জুন শেষ ৭ দিনে জেলায় ২ হাজার ২৯২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৫২৪ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এর আগে ২৫ থেকে ৩১ মে ৭ দিনে ১ হাজার ৪৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩২৭ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর ১৮ থেকে ২৪ মে ৭ দিনে শনাক্তের হার ছিল গড়ে ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
খুলনার ১০০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। ১৫ দিন ধরে রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে। হাসপাতালে টানা ছয় দিন শয্যাসংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছেন। চলতি মাসে প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ১১২ রোগী ভর্তি আছেন। শয্যা না থাকায় মেঝেতে শয্যা করা হচ্ছে। দিন দিন রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ছে। রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল পর্যন্ত হাসপাতালের ১০০ শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি ছিলেন ১১৯ জন। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ রোগী ৯৪ জন। উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছেন আরও ২৫ জন। বর্তমানে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ১৯ জন এবং হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ১৮ রোগী চিকিৎসাধীন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৪১ জন। এ সময়ে এই করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালের ফোকাল পারসন সুহাস রঞ্জন হালদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনা হাসপাতাল ১০০ শয্যা ঘোষিত হলেও এর চেয়ে রোগী বেশি ভর্তি থাকছেন। নির্ধারিত জনবল নিয়ে তাঁদের চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাড়তি শয্যার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। আইসিইউ, এইচডিইউ শয্যা আগের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। তারপরও সেগুলো পূর্ণ থাকছে। আমাদের করোনা ইউনিট-২ চালু করার জন্য প্রস্তুতি আছে। এ জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ জনবল চেয়ে পাঠানো হয়েছে।’