default-image

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতেও আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়। আজ বৃহস্পতিবার রাতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা স্মরণে এক আলোচনা সভায় এ দাবি জানান বক্তারা।

‘১৯৭১ বাংলাদেশ গণহত্যা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বাংলাদেশ গণহত্যার ৫০ বছর’ শিরোনামে ভার্চুয়াল আলোচনা সভার আয়োজন করে যৌথভাবে লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাই কমিশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ।

অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবির ওপর আলোকপাত করে বলা হয়, ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত নয় মাস ধরে এই গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ চলে। যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করে এবং দুই লাখ নারী ও মেয়ে শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা চালায়।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, অনেক বিশ্বনেতার পাশাপাশি মার্কিন রাজনীতিবিদ, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা ‘গণহত্যা বন্ধ কর’ দাবিতে ১৯৭১ সালে বিক্ষোভ করে। দ্য সানডে টাইমস, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, দ্য নিউজউইকের মতো আন্তর্জাতিক অনেক গণমাধ্যম ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ গণহত্যা নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করে। গেরি বাসের ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার এবং ভুলে যাওয়া গণহত্যা’ বইসহ অনেক বইয়ে ১৯৭১ সালে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা চিত্র উঠে আসে। এরপরও বাংলাদেশে গণহত্যা এখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান। প্যানেল আলোচক ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজের অধ্যাপক ও ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্তি নথিভুক্ত প্রকল্পের প্রধান সাচি দস্তিদার, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোয়ান দিজর্জিও-লুতজ্‌, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিষয়ের অধ্যাপক ইয়াসমিন সাইকিয়া এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ১৯৭১ সালে লন্ডনে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সুলতান মাহমুদ শরিফ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী আলীম চৌধুরীর মেয়ে নুজহাত চৌধুরী।

লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বলেন, গণহত্যার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও আলোচনা করবে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা যেভাবে দেশের জন্য জনমত সৃষ্টি করেছিলেন, সেভাবেই ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে এগিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, জাতিসংঘের কনভেনশন অনুসারে, গণহত্যার জন্য যেসব সংজ্ঞা রয়েছে, তার সবকিছুই পূরণ করে বাংলাদেশে গণহত্যা। এরপরও গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণ মানুষ সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ১৯৭১ সালের এক কোটির বেশি মানুষের ভারতে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাও প্রমাণ করে বাংলাদেশে গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল গণহত্যার উপকেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোয়ান দিজর্জিও-লুতজ্‌ বাংলাদেশ গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘শোরগোল’ করার আহ্বান জানান বাংলাদেশকে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ গণহত্যা’ ভূ-রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ডেমোক্রেটিক পার্টির আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিয়া-করতেস বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু গণহত্যা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এ নিয়ে নীরবতা ভাঙতে হবে। বাংলাদেশ গণহত্যাসহ ‘ভুলে যাওয়া সব গণহত্যা’নিয়ে তাঁর শিক্ষার্থীদের পড়াবেন বলে অনুষ্ঠানে জানান অধ্যাপক জোয়ান।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিষয়ের অধ্যাপক ইয়াসমিন সাইকিয়া ১৯৭১ সালে নারী ধর্ষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই নারীরা একই সঙ্গে পাকিস্তানি সেনা ও পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করা বাংলাদেশি সহযোগীদের ধর্ষণের শিকার হতো। সমাজে ওই নারীদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না।

গণহত্যার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবতা অভিশাপগ্রস্থ কিনা সে প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এটা আন্তর্জাতিক অপরাধ। এর স্বীকৃতি হতে হবে আন্তর্জাতিকভাবেই। যুদ্ধাপরাধের বিচারেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে আসেনি। বাংলাদেশ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধের বিচার করেছে।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী কন্যা নুজহাত চৌধুরী বলেন, স্বীকৃতি চাইলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কত সংখ্যক হত্যার শিকার হয়েছে খোঁজ করে। সংখ্যা দিয়ে গণহত্যা বোঝায় না। আজ ৫০ বছরেও কেন আমাদের গণহত্যা প্রমাণ করতে হবে। তিনি পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে ও গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সুলতান মাহমুদ শরিফ বলেন, ১৯৭১ সালে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে হত্যা করা হতো। পাকিস্তানি বাহিনী খুঁজত কারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুসারী।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটে চলা গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয়।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন