default-image

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের যুবক রতন মিয়া। তিন বছর ধরে চারটি গাভি নিয়ে তাঁর ছোট্ট খামার। সেখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে চলে তাঁর সংসার। কিন্তু বন্যার কারণে গো–খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। গরুগুলোকে আগের মতো খাবার দিতে পারছেন না। গরুকে ঠিকমতো খাবার দিতে গেলে সংসারে টানাপোড়েন শুরু হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে সাত দিন আগে খামারের দুটি গাভি বিক্রি করে দিয়েছেন।

শুধু রতন নয়, তাঁর মতো অনেক খামারি গো–খাদ্যের দাম বাড়ার কারণে খামারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। বাধ্য হয়ে অনেকে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।

সরকারপাড়া গ্রামের খামারি শ্যামল সরকার বলেন, ‘মাঠেঘাটে আগের মতো ঘাস নাই। দুধেরও দাম নাই। খড়, ভুসি, বুটের খোসা, ফিডের দাম দিন দিন বাড়োছে। তার ওপর দুনিয়ার সউগ রোগ খামারোত দেখা দেওছে। গরু পুষি আর লাভ হওছে না। ওই জন্যে গরু বেচে দিউচি।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ছোট–বড় মিলে প্রায় দুই শতাধিক গরুর খামার রয়েছে। এ ছাড়াও গৃহপালিত প্রায় ৮৫ হাজার গরু কৃষকদের ঘরে আছে।

কয়েক খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভুসির পাশাপাশি গরুর অন্যতম প্রধান খাদ্য খড়ের দাম বাড়ায় অনেক খামারি গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।

উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন মাস আগেও গো–খাদ্য গমের ভুসি প্রতি বস্তা (৩৭ কেজি) বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২২০ টাকা এবং বুটের খোসা প্রতি বস্তা (২৫ কেজি) ৯৫০ টাকা, খুদ প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ৮০০ টাকা, কিন্তু বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ভুসি ১ হাজার ৫১০ টাকা ও বুটের খোসা ১ হাজার ৩৫০ টাকায়, চালের খুদ ১ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়াও গরুর প্রধান খাদ্য খড়ের মণও বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকা। সব ধরনের ফিডের দামও বেড়েছে। ১০-১১ টাকা কেজিতে ধানের গুড়াও বর্তমানে ১৮-২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২ কেজি ওজনের ছোট একটি হাইব্রিড ঘাসের আঁটিও ২০ টাকায়।

গতকাল সোমবার তারাগঞ্জ হাটে কথা হয় মেনানগর গ্রামের খামারি আফজাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভাই গরু না বেচে করমো কী? গরুর খাবারের যে দাম। ২ টাকার খড়ের আঁটি এখন ১০ টাকা। প্রত্যেক বস্তা গমের ভুসিতে ৩ মাসে দাম বাড়ছে ৩০০ টাকা, বুটের খোসাত ৪০০ টাকা, ১৬ টাকার চালের খুদ এখন ৩০ টাকায় কিনবার নাগোছে। ওই জন্যে গরু পুষি পোষাওছে না।’

আফজালের পাশে এঁড়ে গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মন্ডলপাড়া গ্রামের আবু সাঈদ বলেন, ‘ভাইজান মোরও ১০টা গরুর মোটাতাজা করা ছোট একটা খামার আছে। এ্যালা আর গরু মোটাতাজা করি পোষাওছে না। এবার তো খড়োত আগুন লাগছে। কিন্তু গরুর দাম পানির মতোন। ঠিকমতো খাবার দিবার না পায়া গরুগুলা শুকি যাওছে। উপায় না পেয়া লস করি গরু বেচপার নাগোছে।’

তারাগঞ্জ চৌপথীতে কথা হয় নারায়ণজন গ্রামের এনামুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভাই এবার আকাশের পানিত বোরো ধানের খড় নষ্ট হয়া যাওয়া মুই গরু-বাছুর নিয়া খুব যন্ত্রণায় আছুন। না পাওছি বেচপার, না পাওছি ঠিকমতো খাবার দিবার। মোর মতোন অন্য খামারিরাও গরু-বাছুর নিয়া বিপদে আছে। কায়ও কায়ও এই যন্ত্রণার হাত থাকি বাচপার তকনে গরু বেচেও দেওছে।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে এবারে বোরোর খড় নষ্ট হওয়ায় খড়সংকট দেখা দিয়েছে। ভুসি, ফিড, বুটের খোসা, চালের খুদ ও আমনের খড়ের দাম বেড়েছে। কিন্তু দুধের দাম না বাড়ায় খামারিদের আগের মতো লাভ হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0