default-image

শুষ্ক মৌসুমে ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকত আর বর্ষায় থই থই পানি। ইটভাটার ধুলাবালুতে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছিল এলাকাটি। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১২টি এলাকায় গড়ে ওঠা ১৭২টি ইটভাটা বন্ধ হওয়ায় সেই চিত্র এবার পাল্টে গেছে।

বন্ধ হওয়ায় ইটভাটার আশপাশের অব্যবহৃত জমি এবার সবুজে সবুজে ভরে উঠেছে। এ বছর কৃষকেরা চাষ করছেন বোরো, শর্ষে, শিম, টমেটোসহ নানা ধরনের সবজি।
গাজীপুরে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ফলে অবৈধ ইটভাটামুক্ত হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১২টি এলাকা। এ বছর (২০২০-২১ অর্থবছরে) গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার সব ইটভাটা বন্ধ রয়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের রাজাবাড়ি এলাকার কৃষক আসলাম হোসেন ইটভাটার কারণে চাষাবাদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ বছর সব ইটভাটা বন্ধ হওয়ায় তিনি আবার চাষাবাদ শুরু করেছেন। আসলাম হোসেন বলেন, এবার তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে শর্ষের আবাদ করেছেন। ফলনও অনেক ভালো হয়েছে।

বাইমাইলের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আগে ইটভাটায় জমি ভাড়া দিতাম। এবার ইটভাটা বন্ধ থাকায় জমি স্থানীয় এক কৃষককে বর্গা দিয়েছিলাম। তিনি ওই জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। ধারণা করেছিলাম, চাষ ভালো হবে না। কিন্তু সবকিছু ভালোই হচ্ছে। আশা করি ফলনও ভালো হবে।’

বিজ্ঞাপন

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকাসহ বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে উঠেছে শত শত ইটভাটা। সরকারি অনুমোদন নিয়ে মালিকেরা ভাটা পরিচালনা করছিলেন। এর মধ্যে গাজীপুর সদর উপজেলার একাংশ ও সাবেক টঙ্গী পৌরসভা নিয়ে গঠিত হয় গাজীপুর সিটি করপোরেশন। পরে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুসারে সিটি করপোরেশন এলাকায় ইটভাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ইটভাটার সব স্থাপনা সরিয়ে নিতে মালিকদের চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু ভাটামালিকেরা স্থাপনা সরিয়ে না নিয়ে বিভিন্ন উপায়ে ও অবৈধভাবে সাত বছর ধরে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কড্ডা, বাইমাইল, বাঘিয়া, কাতলাখালী, রাজাবাড়ি, আহাকী, আমবাগ, জয়েরটেক, ইসলামপুর, গাছা, কারখানা বাজার, কাউলতিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে ১৭২টি ইটভাটা পরিচালনা করছিলেন। একপর্যায়ে ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও উচ্ছেদের আদেশ দেন উচ্চ আদালত। পরে পরিবেশ অধিদপ্তর সদর দপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট, গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ইটভাটাবিরোধী অভিযান পরিচালনা শুরু করে গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তর।

২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ১৬ মার্চ পর্যন্ত ইটভাটার ওপর ২৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এ সময় আদালত ১১২টি অবৈধ ইটভাটার আগুন ফায়ার সার্ভিস দিয়ে নিভিয়ে দেন এবং ভেকু দিয়ে ওই সব ভাটা ভেঙে দেওয়া হয়। ওই সব ভাটামালিককে প্রায় চার কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া জরিমানা অনাদায়ে অবৈধ তিনটি ভাটার মালিককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের আদালতের অভিযানের কারণে এ বছর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৭২টি ইটভাটার মধ্যে সব ভাটার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে ওই সব এলাকায় এখন চাষাবাদ শুরু করেছেন এলাকাবাসী। বর্ষার পরপরই অনেক ইটভাটার স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে সেখানে লাউ, শিম, শর্ষে, ধানসহ বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করছেন জমির মালিকেরা। অনেকে নিজেদের জমি বর্গা দিয়েছেন। এতে ওই সব এলাকা সবুজ পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। সবুজে ভরে গেছে পুরো এলাকা। ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালু থেকে দূষণমুক্ত হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন।
জয়েরটেক এলাকার জহিরুল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা জানান, ইটভাটা না থাকায় এর সুফল কৃষকেরা পাচ্ছেন। ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালু থেকে মুক্তি পেয়েছে নগরবাসী।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুস সালাম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুয়ায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো ইটভাটা থাকতে পারবে না। সেই আইন অনুয়ায়ী সব ইটভাটা বন্ধ করা হয়েছে। ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা আবার চাষাবাদ করতে পারছেন।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ইটভাটার কারণে জেলায় কৃষি আবাদ কমে এসেছিল। ইটভাটা বন্ধ হওয়ায় কৃষিজমি ও আবাদ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গোপনে আবার কেউ ইটভাটা চালু করার চেষ্টা করলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন