default-image

করোনার পাশাপাশি রান্নার গ্যাসও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য। করোনায় এ জেলায় ১৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে এ জেলায় গ্যাস থেকে ৯৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ওই সব অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া অনেকের তথ্য ফায়ার সার্ভিসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারাই।

২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব ঘটনার তথ্য রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের হিসাবের খাতায়। এসব ঘটনা নিয়ে খোঁজ করে জানা গেছে, বেশির ভাগ ঘটনাতেই থানায় একটি করে অপমৃত্যুর মামলা হলেও জোর দিয়ে তদন্ত হয়নি। গ্যাসের আগুনে দুই বা একজনের মৃত্যুর মতো ঘটনাতে পুলিশ, তিতাস গ্যাস কিংবা স্থানীয় প্রশাসন কাউকেই ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। ফলে এত মৃত্যু হলেও দায় নিরূপণের কোনো উদ্যোগ নেই। যার কারণে একই রকম ঘটনা ঘটেই চলেছে।

২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত: *নারায়ণগঞ্জে গ্যাস থেকে সৃষ্ট ৯৪টি অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে নিহত ৪৪ জন *৪ সেপ্টেম্বর রাতে পশ্চিম তল্লা এলাকার মসজিদে গ্যাসের আগুনে প্রাণ গেছে ৩৭ জনের। *অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়াদের সঠিক সংখ্যা জানে না ফায়ার সার্ভিস।
বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে একটি ঘটনায় মারা গেছেন ৩৭ জন। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে এশার নামাজের সময় শহরের পশ্চিম তল্লা এলাকায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে ৪০ জন দগ্ধ হন, যার মধ্যে তিনজন কেবল চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। ওই ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় গ্যাসের গন্ধ পেতেন। বিষয়টি তিতাসকে জানিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। এতগুলো মানুষ পুড়ে মারা যাওয়ার পরই তিতাসের তৎপরতা শুরু হয়। এরপর মসজিদের উত্তর পাশের সড়কের মাটি খুঁড়ে তিতাস গ্যাসের পরিত্যক্ত পাইপলাইনে ছয়টি ছিদ্র পাওয়া যায়। ওই ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের গঠিত একটি কমিটির প্রতিবেদনে ১৮ দফা সুপারিশ করে। এর মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে মসজিদ নির্মাণ ও পরিচালনায় নীতিমালা প্রণয়ন, মসজিদে প্রশস্ত দরজা রাখা, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রাখা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে) মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা, তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনের নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যবেক্ষণ করা, গ্যাস–সংযোগ ও লাইন স্থানান্তরে অফিশিয়ালি অনুমোদন, নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয় করা, সব অবৈধ গ্যাস–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ইত্যাদি।

তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। অনেক কর্মকর্তা সুপারিশের বিষয়গুলো ভুলেই গেছেন। তিতাসের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মমিনুল হক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তল্লা মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় তাঁদের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেখানে কী আছে তা দেখে বলতে হবে। তবে পুরোনো অনেক গ্যাসের পাইপলাইন রয়েছে। সেসব পাইপলাইনে লিকেজ থাকতে পারে। লিকেজের খবর পেলে তা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।’

তল্লা মসজিদে ৩৭ জনের মৃত্যুর পর তিতাস গ্যাস ফতুল্লা অঞ্চলের চার কর্মকর্তাসহ আটজনকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও পরে তাঁদের পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে তদন্তে তিতাসের কর্মীদের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। গত ৩১ ডিসেম্বর ২৯ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি।

তল্লা মসজিদের বিপুল প্রাণহানির কারণে ঘটনাটি গুরুত্ব পায়। তবে বেশির ভাগ ঘটনাতেই দায় নিরূপণের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) জায়েদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস লিকেজ ও বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃত্যু হলে মামলা হয়। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে অপমৃত্যুর মামলা হয়। তদন্তে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগ না পেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

সর্বশেষ ৮ মার্চ মধ্যরাতে শহরের পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় হাজী ভিলা নামে একটি ভবনের ছয়তলার ফ্ল্যাটে গ্যাসের সিলিন্ডারের মুখের লিকেজ থেকে ঘরে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হয়। এতে একই পরিবারের শিশুসহ ছয়জন অগ্নিদগ্ধ হয়। এর মধ্যেই দগ্ধ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন শিশুসহ দুজন। তাদের অবস্থাও সংকটাপন্ন।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার এক সপ্তাহ পেরোলেও ওই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। দায় নিরূপণের কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি। ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় কোনো মামলা না হলেও পুলিশ বাদী হয়ে জিডি করেছে। এ ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগও করেনি।

২০২০ সালের ২ জানুয়ারি ভোরে সিদ্ধিরগঞ্জের সিআইখোলা এলাকায় ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে চুলা থেকে নির্গত গ্যাসের বিস্ফোরণে স্বামী-স্ত্রীসহ একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হন। ৭ জানুয়ারি সদর উপজেলার কায়েমপুরে চারতলা বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাটে একইভাবে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে এক দম্পতি দগ্ধ হন। এ দুই দম্পতিকেই পরে দীর্ঘ চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি ভোরে সদর উপজেলার সাহেবপাড়া এলাকায় পাঁচতলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে তিতাসের পাইপলাইন বা চুলা থেকে গ্যাস ছড়িয়ে বিস্ফোরণে একই পরিবারের আটজন দগ্ধ হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও পুলিশ বেশি দূর এগোয়নি। অন্য কোনো সংস্থাও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ফলে কী কারণে ওই ঘটনা ঘটল, তা জানা যায়নি।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এ বি সিদ্দিক বলেন, তল্লা মসজিদে বিস্ফোরণে ৩৭ জনের মৃত্যুতে কারও টনক নড়েনি। সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই। অন্য ঘটনাগুলোতেও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে না, কী করে ঘটনা ঘটল তা সুস্পষ্টভাবে জনগণকে জানানো হচ্ছে না। ফলে গ্যাস থেকে বারবার অগ্নিকাণ্ড ঘটছে, মানুষ মরছে। তিনি বলেন, তিতাস গ্যাস তাদের দায় এড়াতে পারে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। এ বিষয়ে তিতাসেরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন