উপজেলা প্রশাসন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গুরমার বর্ধিতাংশ হাওরটি সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীন। এখানে ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) রয়েছে। এই হাওরের শালদিঘা ফসল রক্ষা বাঁধটির ১২৬ নম্বর প্রকল্প কাজের দৈর্ঘ্য ৫৩১ মিটার। এই কাজের জন্য বরাদ্দ ধরা হয় ১৭ লাখ ৪০ হাজার ৪২১ টাকা। পাউবোর নিয়মানুযায়ী, গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু করে জানুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। অথচ এই বাঁধের কাজ শুরু হয় জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে এবং কোনোরকমে ফেব্রুয়ারিতে শেষ করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধটি নড়বড়ে। বাঁধের মাটি ঝুরঝুরে। কোনো কমপেকশন তথা মাটি দৃঢ়করণের ব্যবস্থা করা হয়নি। বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাসেল আহমদ বলেন, এখানে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ যেনতেনভাবে করা হয়েছে। ভালোভাবে কমপেকশন না হওয়ায় বাঁধটিতে ফাটল দেখা দিয়েছিল। গ্রামবাসীর সঙ্গে তিনি নিজেও বাঁধে কাজ করেছেন। কাজ এখনো চলমান। পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত হওয়া যায়নি।

প্রকল্পের কাজে পিআইসির সভাপতি ও সদস্যসচিব পাউবোর নীতিমালা না মেনে নিজেদের ইচ্ছেমতো বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন করেছেন বলে অভিযোগ। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বাঁধ–সংশ্লিষ্টরা। গুরমার বর্ধিতাংশ হাওরের ১২৬ নম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আবদুল কদ্দুস বলেন, বাঁধের কাজে কোনোরকম গাফিলতি করেননি। বাঁধের নিচের অংশে একটি কুড় (গর্ত) থাকায় পানি ঢুকে এটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসেন বলেন, কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। বাঁধের কাছেই একটি কুড় রয়েছে। এ কারণে বাঁধের নিচ দিয়ে পানি ছুঁয়ে যাওয়ায় এটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, গতকাল শনিবার সকাল ৭টার দিকে এই বাঁধের ১২৬ নম্বর প্রকল্পে ফাটল দেখা দেয়। ধীরে ধীরে ৫০ ফুট স্থানজুড়ে ফাটলের সৃষ্টি হয়। কয়েকজন কৃষকের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে ওই দিন সকাল আটটার দিকে সেখানে মোটরসাইকেলে করে ছুটে যান উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণউড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক বিপ্লব বিশ্বাস ও বাসাউড়া গ্রামের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক সুরঞ্জন সরকার। দুজন মিলে গ্রামে গ্রামে মসজিদে মাইকিং করার ব্যবস্থা করেন।

খবর পেয়ে উপজেলার বংশীকুন্ডা, কাউহানী, নিশ্চিন্তপুর, বাসাউড়া, হাতপাটন, নোয়াবন্দ, সানুয়া, মাকরদী গ্রামের তিন শতাধিক মানুষ বাঁশ, কোদাল, বস্তা নিয়ে সেখানে জড়ো হয়ে ফাটল মেরামতের কাজ করেন। ওই দিন বেলা একটার দিকে সেখানে উপস্থিত হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনতাসির হাসানসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা। ওই দিন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আট গ্রামের মানুষ বাঁধের ফাটল বন্ধসহ বাঁধটি মজবুতের কাজ করেন।

কৃষক বিপ্লব বিশ্বাস ও স্কুলশিক্ষক সুরঞ্জন সরকার বলেন, ওই হাওরে তাঁদের জমি আছে। বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ার খবর পেয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে লোকজন দিয়ে মসজিদে মাইকিং করেন তাঁরা। তিন শতাধিক মানুষ এসে বিকেল চারটা পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার কাজ করেন। এখনো কিছু মানুষ বাঁধ রক্ষার কাজে নিয়োজিত। এ অবস্থায় বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঝুঁকি অনেকটা কমেছে।

বংশীকুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক সামিউল কিবরিয়া বলেন, গতকাল রাতে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের পানির প্রবল ঢেউয়ে বাঁধটি যাতে কোনোরকম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য গ্রামবাসী পালা করে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধের কাজ করছেন। ফসল কাটার আগপর্যন্ত এই কাজ অব্যাহত থাকবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম বলেন, এটি মেরামত করায় এখানকার গুরমা ও গুরমার বর্ধিতাংশ হাওরের পাঁচ হাজার হেক্টর বোরো জমির ধান ফসলডুবি থেকে রক্ষা পেয়েছে। ইউএনও মুনতাসির বলেন, হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ মেরামতকাজে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।