প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরে অব্যাহতভাবে পানি বেড়েছে। এতে হাওরের আশপাশের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। স্থানীয় লোকজন মনে করছেন, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার হাওরে পানি বেশি হয়েছে। আগে যাঁদের বাড়িঘরে পানি ওঠেনি, এবার ওই বাড়িগুলোতেও পানি উঠেছে। আবার অন্য বছর বাড়িঘরে পানি উঠলেও দু-এক দিনেই পানি নেমে গেছে। তবে এবার প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বানের পানি স্থায়ী হয়েছে। ফলে বড়লেখার হাওরপারের সুজানগর, তালিমপুর, বর্নি ও দাসেরবাজার ইউনিয়নে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছেন।

শঙ্কু দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোড (রাস্তা) বন্ধ, সবকিছু বন্ধ। পাইকার আইতো পারের না। দুই দিন পানি ভাঙি নতুন বাজার গেছি। কেউ নাই। বিক্রি না করিয়াই ফিরত আইছি। সাত দিন ধরি পানি। নাও-ও (নৌকা) নাই। রাস্তাত বুকপানি। চলাফেরার উপায় নাই।’

default-image

স্থানীয় লোকজন বলছেন, হাকালুকির পানি খুব শিগগির নামেও না, ধীরে ধীরে নামে। ফলে হাওরপারের মানুষ দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন। ২০০৪ সালের বন্যার উদাহরণ টেনে শঙ্কু দাস বলেন, ‘ঘরর মধ্যে ঘটাসমান (পায়ের পাতার ওপর পর্যন্ত) পানি। একটু জায়গা নাই বইয়া কাজ করার। ২০০৪ থাকি এবার এক হাত বেশি পানি। অন্য বছর অত পানি অয় না। অইলেও কোনো সময় উঠানো উঠছে। আগর দিন (আগের দিন) উঠছে, বাদর দিন (পরের দিন) নামি গেছে। এবার বিপদের মাঝে আছি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাওরপারের শীতলপাটির কারিগরেরা উত্তরাধিকারসূত্রেই এই কাজ শিখেছেন। সারা বছরই তাঁরা শীতলপাটি বোনেন। প্রতি সোম ও শুক্রবার এলাকার নতুন বাজারে (বাংলাবাজার) সাপ্তাহিক হাট বসে। হাটবারে তৈরি শীতলপাটি বিক্রি করেন তাঁরা। শীতলপাটি বিক্রির আয় দিয়েই তাঁদের সংসারের চাকা সচল থাকে। তবে বন্যার কারণে এখন তাঁদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

শঙ্কু দাস জানালেন, প্রতি সপ্তাহেই একটি পরিবার এক থেকে দুটি শীতলপাটি তৈরি করে। সেটা বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হয়। তবে এখন শীতলপাটির তেমন চাহিদা নেই। তারপরও যা চলে, তা দিয়েই সংসারের খরচ মেটাতে হয়। বিক্রি শেষে আবার নতুন শীতলপাটি তৈরিতে হাত দেন তাঁরা। শীতলপাটির অন্যতম প্রধান উপকরণ মূর্তাগাছ (মূর্তা বেত)। এখন সব মূর্তাগাছ পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে গাছ সংগ্রহ করা, বেত তৈরি ও বানানো—কিছুই সম্ভব হচ্ছে না।

শঙ্কু দাসের সঙ্গে আলাপের ফাঁকে গগড়া গ্রামের দুই কারিগর নীরেন্দ্র কুমার দাস ও ফরিন্দ্র দাসের সঙ্গে কথা হলো। তাঁরা জানালেন, শীতলপাটি বিক্রি করতে পানি ভেঙে বাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করেছেন। কোনো ক্রেতার দেখা পাননি। সবার উদ্বেগ, এই সময় তাঁরা কীভাবে সংসার চালাবেন!

শঙ্কু দাস যেন সবার হয়েই বললেন, ‘পাটি বানাইতাম পাররাম না। বেচতাম পাররাম না। আয় নাই। খরচ-মরচ খাইতাম কেমনে। আইজ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো সহযোগিতা পাইছি না।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন