বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে বালুচরে দাঁড়িয়ে রাখা হয়েছিল কয়েকটি ঘোড়া। ঘোড়া দেখে পর্যটকেরা সেখানে গিয়ে দাঁড়ান। দামদর করে ওঠেন ঘোড়ার পিঠে। কেউ তোলেন ছবি, কেউ দেন এক চক্কর দৌড়। তাতেই রাজ্যের আনন্দ চোখে-মুখে।

ঈদের পর টানা ১০ দিন বিশ্বের এই দীর্ঘতম সৈকতে সমবেত হয়েছেন ১০ লাখের বেশি পর্যটক। এর মধ্যে কতজন পর্যটক ঘোড়ার পিঠে চড়েছেন, কিংবা ঘোড়ার পিঠে উঠে ছবি তুলেছেন, তার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। তবে ঘোড়া ব্যবসায়ীদের ধারণা, অন্তত দুই লাখ পর্যটক ঘোড়ার পিঠে উঠে ছবি ও চক্কর মেরেছেন।

সৈকতের লাবণী, সিগাল, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ঘোড়া আছে ৬১টি। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী, পাটোয়ারটেক, টেকনাফ সৈকতেও বেশ কিছু ঘোড়া আছে। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোড়াগুলোর পিঠে চড়ে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়াতে পারেন।

কয়েকজন ঘোড়াচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘোড়ার পিঠে উঠে ছবি তুলতে গেলে গুনতে হয় ৫০ টাকা। সময় লাগে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট। ঘোড়ার পিঠে উঠে বালুচরে চক্কর দিতে লাগে ১০০ টাকা। সময় যায় সর্বোচ্চ ১২ মিনিট। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত এক কিলোমিটার আসা-যাওয়াতে এক চক্কর। চক্কর দিতে যাঁদের প্রাণ হিম হয়ে আসে, তাঁরাই ঘোড়ার পিঠে বসে স্মৃতির ছবি তুলে রাখেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা ছবি তোলার কাজটি করেন বেশি। প্রতিদিন একটি ঘোড়া সর্বোচ্চ ৫৫ বার চক্কর দিতে পারে।

default-image

সৈকতের সবচেয়ে বড় ঘোড়াটির নাম হিরা। মালিক শহরের সমিতি পাড়ার ফরিদা বেগম। তিন মাস আগে ৯ বছর বয়সী এই ঘোড়াটি তিনি ঢাকা থেকে আড়াই লাখ টাকায় কিনে আনেন। ঈদের দিন থেকে পর্যটকদের পিঠে চড়াতে ঘোড়াটি নামানো হয় সৈকতে।

আজ বেলা ১১টায় ঢাকার বংশাল থেকে আসা ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেন নিজের ১২ বছর বয়সী এক মেয়েকে নিয়ে আসেন হিরার কাছে। প্রথমে মেয়েকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিলেন, ভয়ে কাতর মেয়ে। ছবি তোলা শেষ। এরপর মেয়ের পাশে নিজে বসে তোলা হলো আরও ছবি। উপস্থিত কয়েকজন বলেন, মেয়েকে নিয়ে এক চক্কর দিয়ে আসতে। কিন্তু চালকের পেছনে বসে সাদ্দাম মেয়েকে নিয়ে চক্কর দিতে রাজি হলেন না।

সাদ্দাম হোসেন বলেন, ঘোড়ার পিঠে চড়তে দম লাগে, লাগে প্রশিক্ষণ। চালকের পেছনে বসে ঘোড়ার চড়তে কোনো আনন্দ নেই।  

ঘোড়াচালক তানভির (১৮) জানান, সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়িয়ে ৮০০ টাকা পাওয়া গেছে। সন্ধ্যা পযন্ত আরও দেড় হাজার টাকা পাওয়া যেতে পারে। সারা দিন ঘোড়া চালিয়ে সে মজুরি পায় ৬০০ টাকা।

প্রতিদিন একটি ঘোড়া সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা আয় করতে পারে। এর মধ্যে ঘোড়ার খাবার ৫০০ টাকা, চালকের মজুরি ৬০০ টাকা এবং চালকের ভাত ও চা–নাশতার খরচ ৩০০ টাকা বাদ দিলে দেড় হাজার টাকার বেশি আয় থাকে না।
মো. আলম, ঘোড়ামালিক, সমিতিপাড়া,কক্সবাজার

শহরের সমিতিপাড়ার মো. আলম ১২টি ঘোড়ার মালিক। তিনি বলেন, প্রতিদিন একটি ঘোড়া সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা আয় করতে পারে। এর মধ্যে ঘোড়ার খাবার ৫০০ টাকা, চালকের মজুরি ৬০০ টাকা এবং চালকের ভাত ও চা–নাশতার খরচ ৩০০ টাকা বাদ দিলে দেড় হাজার টাকার বেশি আয় থাকে না।

সৈকতে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে  সমিতি পাড়ার ইসলাম খাতুনের তিনটি, কায়সার হামিদের তিনটি, কলাতলীর জয়নাল আবেদীনের তিনটি ঘোড়া দিয়ে পর্যটকদের টানা হচ্ছে। এসব ঘোড়া থেকেও প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ ঘোড়াচালকের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছর। এত কম বয়সী শিশু দিয়ে ঘোড়া চালনার বিষয়টি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন পর্যটকেরা।

রাজশাহী শহরের ব্যবসায়ী নজিবুল ইসলাম বলেন, সৈকতের কিছু জায়গায় বাচ্চা ঘোড়া দেখা যায়, কিছু ঘোড়া রোগাক্রান্ত, অপুষ্টিতে ভুগছে। এসব ঘোড়ার পিঠে উঠতে বিবেকে বাধে।  

সুগন্ধা সৈকতে ঘোড়া পিঠে বসে ঘুরছে সোহেল আহমদ (১৩)। পর্যটকেরা ঘোড়ার সামনে এলেই সোহেল তাঁদের বলেন, ‘স্যার, ঘোড়ায় চড়বেন? ছবি তুললে ৫০ টাকা, এক চক্কর দিলে ১০০ টাকা। কিন্তু শিশু চালক দেখে কেউ ঘোড়ায় চড়ার আগ্রহ দেখান না।

ঘোড়া মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, আগে এখানে ঘোড়া ছিল ৯০টি। করোনা মহামারির দুই বছর সৈকতে পর্যটকের সমাগম নিষিদ্ধ ছিল, তখন ঘোড়ার ব্যবসাও বন্ধ ছিল। এ সময় অভুক্ত থেকে অনেক ঘোড়া মরে গেছে। ২০-২২ জন ঘোড়ার মালিক ৫০-৬০টি ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন শহরের বিভিন্ন সড়ক–অলিগলিতে। খাদ্যের সন্ধানে ঘোরাফেরা করত। গাড়ির ধাক্কায়, চাকায় চাপা খেয়ে বহু ঘোড়া হতাহত হচ্ছে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ৩ মে (ঈদের দিন) থেকে সৈকতে নামানো হয়েছে ৬১টি ঘোড়া। সৈকত পর্যটকে ভরপুর থাকলে প্রতিটি ঘোড়ার বিপরীতে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হয়। পর্যটক না থাকলে ঘোড়ার খাবার ও চালকের মজুরির বিপরীতে মালিকের খরচ যায় এক হাজার টাকা।

শিশুদের দিয়ে ঘোড়া পরিচালনার বিষয়ে ফরিদা বেগম বলেন, প্রাপ্তবয়স্কের কেউ ঘোড়ার চালনায় আসতে আগ্রহী না। তাই দরিদ্র ঘরের ছেলেরা ঘোড়া চালিয়ে সংসার চালাচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন