নার্সিং কলেজের শিক্ষক অঞ্জলী দেবীকে গত ১০ জানুয়ারি সকালে চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় তাঁর বাসার কাছেই কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৮ দিন পার হলেও কারা কী উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যা করেছে, তা বের করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার বাদী অঞ্জলীর স্বামী চিকিৎসক রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে জানান, সর্বশেষ ২১ দিন আগে পুলিশ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তাঁর দাবি, হরতাল-অবরোধে পুলিশ ব্যস্ত থাকায় তদন্ত এগোচ্ছে না।
অঞ্জলী হত্যা মামলা তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। হরতাল-অবরোধে তদন্তে ভাটা পড়েছে কি না, জানতে চাইলে এ মামলার তদন্ত দলের প্রধান ও ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার হাছান চৌধুরী জানান, নাশকতারোধে পুলিশ কাজ করলেও গুরুত্ব দিয়েই অঞ্জলী হত্যার তদন্ত চলছে।
তবে নাম না প্রকাশের শর্তে চট্টগ্রামের অন্তত তিনটি আলোচিত মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, হরতাল-অবরোধে ভোর পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। রাত আটটায় থানায় এসে আবার অলিগলিতে মোটরসাইকেল ডিউটি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে টহল দেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদারকি করতে হয় তাঁদের। রাত ১২টায় বাসায় ফিরে পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় আবার ডিউটিতে যেতে হয়। কোথাও নাশকতা হলে জবাবদিহি করতে হয়। এসব সামাল দিয়ে মামলার তদন্তকাজে সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) বনজ কুমার মজুমদার জানান, সহিংসতারোধে পুলিশ দিনরাত মাঠে রয়েছে। জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য চট্টগ্রামে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। আলোচিত মামলাগুলোর তদন্তে কিছুটা ব্যাঘাত হলেও তদন্ত চলছে।
টানা অবরোধ-হরতালে মামলার তদন্তের মতো বিচারকাজও এগোচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। আদালত সূত্র জানায়, চাঁদপুরের বাক্প্রতিবন্ধী শিশু সাফিয়া আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তিন মাস আগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। গত এক মাসে এই মামলার শুনানির জন্য ধার্য ১৫ দিনে একবারও হাজির হননি সাক্ষী।
মামলার বাদী সাফিয়ার বাবা ডিপচি মিয়া প্রথম আলোকে জানান, সমন পেলেও হরতাল-অবরোধের কারণে চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রামে আসতে পারছেন না তিনি। ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর শিশু সাফিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি আইয়ুব খান প্রথম আলোকে জানান, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ৩৭টি মামলার বিচার চলছে। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন তারিখ রাখা হয়। এ ট্রাইব্যুনালে ১৩৫ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা না গেলে মামলাগুলো আগের আদালতে ফেরত যাবে।
কুকুর লেলিয়ে মেধাবী ছাত্র হিমাদ্রী হত্যা মামলাও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে রয়েছে। হিমাদ্রীর মা গোপা মজুমদার জানান, মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু হরতাল-অবরোধে সাক্ষীরা ভয়ে হাজির হচ্ছেন না। মামলাটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ফেরত গেলে বিচার পেতে বিলম্ব হবে।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালসহ চট্টগ্রামের ৭৪টি আদালতে হরতালের দিন কোনো মামলার শুনানি হচ্ছে না। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, অবরোধে চট্টগ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালু থাকলেও বারের নিয়ম অনুযায়ী হরতালে কোনো মামলার শুনানি হয় না।
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী জানান, অবরোধে মামলার বাদী, আসামি ও সাক্ষীরা হাজির হতে না পারায় বিচারপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী জানান, মামলার বাদী, সাক্ষী ও আসামিরা হাজির হতে আদালত সমন ও পরোয়ানা জারি করলে পুলিশ তা কার্যকর করছে। কিন্তু সমন পাওয়ার পরও হরতাল-অবরোধের কারণে অনেকেই হাজির হচ্ছেন না। কেউ আদালতে আসার জন্য নিরাপত্তা চাইলে পুলিশ তা দেবে।
৮ জানুয়ারি কর্ণফুলী নদীর নারকেলতলা এলাকা থেকে হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিশন বিশ্বাসের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তাঁর বাবা রতন বিশ্বাস বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরিবারের দাবি, বাসা থেকে ডেকে নিয়ে তাঁকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জহির হোসেন জানান, মিশনের মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত চলছে। তিনি জানান, হরতাল-অবরোধে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ কারণে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
১৩ জানুয়ারি রাতে সিনেমা প্যালেস মোড়ে ৬৫টি সোনার বারসহ দুই দোকান কর্মচারী দুলাল ধর ও পরিতোষ দেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বারগুলো দুবাই থেকে চোরাইপথে আনা হয়েছে বলে তাঁরা পুলিশকে জানান। দুই আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী দোকানমালিক সোনা ব্যবসায়ী নারায়ণ চৌধুরীসহ তিনজনকে আসামি করে মামলা করা হয়। তবে নারায়ণ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই মো. কামরুজ্জামান জানান, হরতাল-অবরোধে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এর মধ্যেও বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে নারায়ণকে ধরতে। তাঁকে ধরতে পারলে সোনা চোরাচালানিদের একটি দলকে ধরা যেত।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন