বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানা এলাকার একটি রিকশাস্ট্যান্ডে হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ১৩ বছরের কিশোর অন্তর। তার কাজ স্ট্যান্ডে থাকা অটোরিকশাগুলোর সিরিয়াল ঠিক রাখা। স্কুল বন্ধের সময় বেকার ঘরে বসে না থেকে এই কাজে কাজে যোগ দিয়েছিল সে। কথা ছিল স্কুল খুললে কাজ ছেড়ে আবার পড়াশোনায় ফেরা হবে। মুন্নু টেক্সটাইল মিলস উচ্চবিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত সে। দীর্ঘ বিরতি পর অন্তরের স্কুল আবার খুলেছে। কিন্তু কাজ ছেড়ে তার শ্রেণিকক্ষে ফেরা হচ্ছে না।

অন্তর বলে, তারা চার ভাই–বোন। বাবা নেই। এত দিন বড় ভাই আর মায়ের আয়েই পুরো পরিবার চলত। কিন্তু করোনার সময় ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছেন। এর পর থেকেই সংসার খরচ নিয়ে মা বেকায়দায় পড়েছেন। এদিকে স্কুল বন্ধ ছিল তাই সংসারের হাল ধরতেই কাজে যোগ দিয়েছিল সে। এখন কাজ বাদ দিলে আবারও পুরো পরিবার বেকায়দায় পড়বে। তাই স্কুলে ফেরার আশা অনেকটাই ফিকে তার।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থীই লেখাপড়া বাদ দিয়ে যোগ দিয়েছিল কাজে। তাদের কেউ নিজের ইচ্ছায়, কেউবা পরিবারের প্রয়োজনে কাজে যোগ দিলেও তারা এখন পুরোদস্তুর শিশু শ্রমিক। দীর্ঘ ১৮ মাস পর স্কুল খুললেও তাদের স্কুলে ফেরার সম্ভাবনা খুব কম। তাদের আয়ের ওপরই এখন পরিবারগুলো নির্ভরশীল। তাই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে চাইলেই তারা আর স্কুলে ফিরতে পারছেনা। আবার দীর্ঘ বিরতিতে অনেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

স্কুল খোলার ১৮ দিন পার হলেও জেলার অধিকাংশ স্কুলগুলোতে এখনো উপস্থিতির হার কম বলে জানা গেছে। এর মধ্যে গাজীপুর শহর এলাকার স্কুলগুলোতেই উপস্থিতির হার সবচেয়ে কম। এর কারণ হিসেবে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকেরা। এ ছাড়া শহর এলাকার নিম্ন আয়ের অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার গ্রামে চলে গেছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

জেলার বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজ। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পঞ্চম শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী ১৫০ জন। এর মধ্যে স্কুল খোলার প্রথম দিন মোট উপস্থিত ছিল ৫৯ জন। ১৮ দিন পর অর্থাৎ, গতকাল বৃহস্পতিবার উপস্থিতি দাঁড়ায় ৮৫ জন। এখনো এই শ্রেণিতে অনুপস্থিতির হার ৫৬ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে এর মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী কাজে জড়িয়ে পড়া বা করোনায় বেকায়দায় পড়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এ কারণে উপস্থিতি এখনো কম। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়তই অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলছি। তাদেরকে স্কুলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’

গাজীপুর ভাষাশহীদ কলেজের অধ্যক্ষ ও সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য মুকুল কুমার মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় যারা কাজে যোগ দিয়েছিল, তাদের ওপর পরিবারের একধরণের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, যার কারণে তারা চাইলেই কাজ বাদ দিয়ে স্কুলে ফিরতে পারছে না। তাদেরকে পুনরায় শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি উদ্যোগ আর সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যেভাবেই হোক শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে হবে। অন্যথায় সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন