লোকমান মিয়া বলেন, ২০১৭ সালের পর সুনামগঞ্জে অকালবন্যা হয়নি। তাই নির্বিঘ্নে ফসল তুলতে পেরেছেন। এবার ২০১৭ সালের মতো অসময়ে নেমেছে উজানের ঢল। এতে ঝুঁকিতে পড়ে হাওরের ধান। তখন অন্যদের সঙ্গে তিনিও বাঁধে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছেন। গত তিন-চার দিনে ঢলের চাপ কিছুটা কমে আসায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু এখন এলাকায় খবর রটে গেছে, আবার ঢল নামবে। তাই চার ছেলে সাদেক মিয়া (২২), আদেক মিয়া (১৮), বিলাল মিয়া (১২) ও ছোট ছেলে হিরণ মিয়াকে (১০) নিয়ে আজ রোববার হাওরে ধান কাটতে নেমেছেন।

এই ধান আরও দু-চার দিন পরে কাটলে ভালো হতো জানিয়ে লোকমান মিয়া বলেন, ‘মনে ভয় ঢুকছে। পরে যদি সব ধান পানিতে ভাইসা যায়, তাইলে তো সব শেষ। এর লাগি সকালে পুয়াইনতেরে (ছেলেদের) কইছি, আর অপেক্ষা খরতাম না, হাওরে চলো, ধান কাটতাম।’

লোকমান মিয়া জানালেন, আতঙ্কে তাঁর মতো অনেকেই ধান কাটা শুরু করেছেন। এর মধ্যে কিছু ধান পেকেছে, আবার কিছু আছে অপরিপক্ব। সপ্তাহখানেক সময়ে গেলে পুরো ধানই পেকে যেত।

সাদেক মিয়া বলছিলেন, এই জমি আবাদের খরচ জোগাতে বেশ কিছু টাকা ঋণ করতে হয়েছে তাঁদের। যদি ধান না পান, তাহলে কিভাবে এক বছর চলবেন, আর দেনাই কিভাবে শোধ করবেন, সেই চিন্তায় ধান কাটা শুরু করেছেন তাঁরা।

হালির হাওরের আরও কিছু স্থানে একইভাবে কৃষকদের ধান কাটতে দেখা গেছে। আবার অনেকেই ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাধানগর গ্রামের কৃষক মুহিবুর রহমান বলেন, হাওরে ব্রি-২৮ ধান কিছু কিছু পেকেছে। তবে হাওরের বেশির ভাগ ধানই ব্রি-২৯, যেটি এখনো পাকেনি। তিনি বলেন, ‘এই ধানই আমরার সব। পরিবারের এক বছরের খানি, সন্তানদের লেখাপড়া, বিয়েশাদি সব এই ধানের ওপর নির্ভর করে। ধান পাইলে হাওরের কৃষকেরা সুখী। কোনো কারণে ধান নষ্ট হইলে কৃষক পরিবারে কষ্টের সীমা থাকে না।’

বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, ২০১৭ সালের মতো এবার মার্চ মাসের শেষ দিকে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপকভাবে পাহাড়ি ঢল নামে। তবে এ সময় সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি না হওয়ায় রক্ষা হয়েছে। মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে কাজ করতে পেরেছেন। এতে অনেক হাওর রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এখন আবার ঢল আসছে শুনে কৃষকসহ সবার মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু ধান পেকেছে, আবার আতঙ্কে অনেকে অপরিপক্ব ধান কাটা শুরু করেছেন।

কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ২২০ মেট্রিক টন। গত সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন হাওরে পাহাড়ি ঢলে ৬ হাজার ১০ হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ১ হাজার ৪৬০ হেক্টর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠে ধান কাটার মেশিন আছে। মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা আছে। আর যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না আসে তাহলে সুনামগঞ্জে বোরোর ভালো ফলন হবে।