চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে ওরা
ওরা সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অল্প বয়সে বহু বাধা–বিপত্তি পেরিয়েছে। কষ্ট করে পড়াশোনা করে অর্জন করেছে সাফল্য।
টাকার অভাবে একবেলা ভালো খাবার জোটেনি। কারও বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছেন। সংসারের খরচ জোগাতে কেউ দিনে কাজ করে, রাতে পড়াশোনা চালিয়েছে। আবার কেউ কেউ মাঠে গরু চরানো, ধান কাটার কাজ করেছে। কিন্তু পড়া থামায়নি। এত শ্রম, ঘামের ফল পেয়েছে সবাই। এবার এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে ওরা। মেধাবী এই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
একবেলা ভালো খাবারও জোটেনি রাসেলের
বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রির জোগালি। রোগে ভুগে ছয় মাস ধরে বেকার। ছাগল ও হাঁস পালন করে মা কোনো রকমে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। টাকার অভাবে কোনো দিন একবেলা ভালো খাবার জোটেনি। নদীভাঙা পরিবারটি থাকে অন্যের জমিতে। সেই পরিবারের সন্তান রাসেল শেখ এবার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার চৌধুরী আবদুল হামিদ একাডেমি থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে। উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের চর বরাট এলাকায় ছাপরা একটি ঘরে মা–বাবা, তিন ছোট বোনের সঙ্গে থাকে রাসেল। ঘরে সবার ঠাঁই হয় না। তাই রাসেল শোয় বারান্দায়।
বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া হয়নি রাসেলের। উল্টো নিজে গৃহশিক্ষকতা করে পোশাক, খাতা–কলম কেনার টাকা জোগাড় করত। ভালো কলেজে পড়ে আদর্শ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে রাসেলও। চৌধুরী আবদুল হামিদ একাডেমির বিজ্ঞানের শিক্ষক মো. বসির উদ্দিনের ভাষ্য, রাসেল খুব বিনয়ী ও মেধাবী। সহযোগিতা পেলে ছেলেটা ভবিষ্যতে ভালো করবে।
সৎমায়ের সঙ্গে থাকতে চায় না শ্রাবণী
শ্রাবণী আক্তার যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, তখন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। সেই থেকে ছোট ভাই ও মায়ের সঙ্গে নানা বাড়িতে আছে শ্রাবণী। এবার এসএসসিতে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। এখন বাবা শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, সৎমায়ের কাছে থাকলে পড়ালেখার খরচ দেবেন। কিন্তু অসহায় মায়ের কথা ভেবে সে বাবার শর্তে রাজি হতে পারছে না। তবে লেখাপড়া কীভাবে এগোবে, তা নিয়েও তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচখৈড় মধ্যপাড়ার আজিজ সোনার ও জয়নব খাতুনের মেয়ে শ্রাবণী। সে দিঘাপতিয়ার উত্তরা বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি দিয়েছিল। বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে শ্রাবণী।
দিনে কাজ করে রাতে পড়ত হানিফ
‘ছেলেটার খুব কষ্ট। দিনোত মাইনষের বাড়িত কাম করে, রাইত জাগি পড়া পড়ে। এল্যা পাড়ার মানুষ কয় তোমার ব্যাটাটা তো সোনা। শুনি মোর বুকটা ফাটি যাওচে। কিন্তুক মুইতো হনু গরিব মানুষ। একদিন কামোত না গেইলে প্যাটোত ভাত যায় না। ছেলেটাক ফির কলেজোত পড়ামো কোনটে থাকি?’ বলতে বলতে এই হতদরিদ্র মায়ের চোখ ছলছল করে ওঠে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাঁড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কিসামত মেনানগর বড়বাড়ি গ্রামের ইসমোতারা বেগমের কষ্টের সংসারে খুশির বার্তা এনেছে ছেলে হানিফ মিয়া। সে এবার ডাংগীরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। হানিফের বাবা সামছুল ইসলাম আগে দিনমজুরি করতেন। অসুস্থতার কারণে তিনি এখন বেকার।
হানিফ মিয়া বলে, ‘অন্যের জমিতে কাজ করে নিজের পড়ার খরচ নিজে জুগিয়েছি। আমরা ইচ্ছা পড়ালেখা করে ডাক্তার হব। কিন্তু অভাবের সংসারে সেটা কি সম্ভব?’
ফলাফলের দিন তৌহিদ মাঠে ধান কাটছিল
ছোটবেলা থেকে মাঠে গরু চরাত। একটু বড় হয়ে বাবার সঙ্গে খেতখামারের কাজে যুক্ত হয়। যেদিন এসএসসির ফল ঘোষণা হয়, তৌহিদ খান তখন মাঠে ধান কাটায় ব্যস্ত। মাঠে বসেই নিজের জিপিএ–৫ পাওয়ার খবর বন্ধুদের মুখে শুনল। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার দধিভাঙ্গা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলামের ছেলে তৌহিদ খান। সে–ও ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তৌহিদ ছোট। সে দধিভাঙ্গা আবদুল হামিদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাফল্যের সঙ্গে পাস করেছে।
দধিভাঙ্গা আবদুল হামিদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, ‘তৌহিদ মেধাবী ছাত্র। সে কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। আমরা তাকে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলাম। সাধ্যমতো পড়াশোনায় সহযোগিতা করেছি।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন মুক্তার হোসেন, নাটোর; এম রাশেদুল হক, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী; রহিদুল মিয়া, তারাগঞ্জ, রংপুর ও এ কে এম ফয়সাল, পিরোজপুর]